মোঃ আব্দুল আউয়াল।
বাংলার সাংস্কৃতিক পরিসর বহু শাখা–প্রশাখায় সমৃদ্ধ। বৈচিত্র্যময় জাতিসত্তা, জীববৈচিত্র্যের মতোই এদেশের সংস্কৃতিতে নানা ধারার মিলন ও মিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। এই অঞ্চলের মানুষ প্রকৃতিনির্ভর জীবনযাপনের মধ্যেই নির্মাণ করেছে তাদের নিজস্ব জীবনদর্শন, অতীন্দ্রিয় ভাবনাকে। বাংলার এই বহুবর্ণ সাংস্কৃতিক রূপকে এক ভিন্ন মাত্রায় উন্নীত করেছে যে ধারাটি, তা হলো বাউলধারা। বাউল কেবল একটি সংগীতধারা নয়; এটি এক জীবনচিন্তা, এক দার্শনিক পথযাত্রা এবং মানবমুক্তির সন্ধানমুখী এক গভীর সাধনা। মানব হৃদয়ের আর্তি, সহজ পথের খোঁজ এবং সব ধর্মীয় গোঁড়ামির ঊর্ধ্বে মানবসত্তার জয়গান—বাউলধারাকে বিশ্বসভায় দিয়েছে এক স্বতন্ত্র স্থান।
বাউলধারার উৎপত্তি নিছক কোনো একক ধর্মীয় বা সামাজিক আন্দোলনের ফল নয়; বরং এটি বিভিন্ন ধর্ম–দর্শন ও লোকাচারের সংমিশ্রণে গড়ে ওঠা এক স্বতন্ত্র জনধারা। বাউলকে যদি একটি বহুস্তরী নদী হিসেবে কল্পনা করা হয়, তবে তার উৎসমুখে রয়েছে একাধিক দার্শনিক ও লোকায়ত স্রোত।
‘বাউল’ শব্দের ব্যুৎপত্তি ও তাৎপর্য
‘বাউল’ শব্দটি নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশের মতে এটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ ‘বাতুল’ থেকে, যার অর্থ উন্মাদ, পাগল বা প্রেমে আত্মহারা। আবার কেউ কেউ আরবি শব্দ ‘আউলিয়া’ (আল্লাহর প্রিয়জন) থেকে এর উদ্ভব বলে মনে করেন। তবে বাউলদের জীবনযাপন, তাদের উন্মুক্ত চলন, সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির প্রতি তাদের নিরাসক্তি এবং তাদের দেহতত্ত্বভিত্তিক সাধনা—এই শব্দটির ‘বাতুল’ বা ‘উন্মত্ত’ অর্থের দিকেই বেশি ইঙ্গিত করে। বাউলরা নিজেদের ‘মনের মানুষ’ বা ‘সহজ মানুষে’র সন্ধানে সর্বদা বিভোর থাকেন, তাই জাগতিক চোখে তারা বাতুল।
“আপন ঘরের খবর নাই, মিছে সে তার হাটে যায়।” – বাউল গান
এই উন্মত্ততা বাউলদের কাছে কোনো মানসিক বিকার নয়, বরং এটি ঐশ্বরিক প্রেমে বা পরম সত্যের সন্ধানে এক গভীর আত্মনিয়োগ।
মূল তিন দার্শনিক স্রোতের সংযোগ
বাংলার বাউলধারার শিকড় খুঁজতে গেলে কমপক্ষে দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত ফিরে যেতে হয়। বাউলধারাকে গড়ে তুলেছে মূলত তিনটি শক্তিশালী দার্শনিক ও ধর্মীয় ধারা: সহজিয়া বৌদ্ধ, সুফি-ফকিরি এবং বৈষ্ণব সহজিয়া।
ক. সহজিয়া বৌদ্ধ ও নাথপন্থের প্রভাব
বাউলদের আদি উৎসের অন্যতম প্রধান ধারা হলো সহজিয়া বৌদ্ধধর্ম। এই ধারার সাধকরা বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে দশম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীতে সক্রিয় ছিলেন। সহজিয়ারা দেহকেন্দ্রিক সাধনার ওপর বিশ্বাসী ছিলেন এবং তাদের সাধনার মূল লক্ষ্য ছিল ‘সহজ’ বা স্বভাবসিদ্ধ সত্যকে মানবদেহের ভেতরে উপলব্ধি করা। তারা বাইরের আচার-অনুষ্ঠান ও মূর্তিপূজাকে প্রত্যাখ্যান করে মানুষের ভেতরেই দেবত্বের সন্ধান করতেন। বাউলদের দেহতত্ত্ব, ‘সহজ সাঁই’ বা ‘মনের মানুষ’ এবং সাধনায় গুরু-নির্ভরতার ধারণা অনেকাংশেই সহজিয়া সিদ্ধাচার্যদের কাছ থেকে এসেছে। নাথপন্থের যোগ-সাধনার প্রভাবও বাউলদের দেহভিত্তিক সাধনায় লক্ষ্যণীয়।
খ. সুফি-ফকিরি ধারা ও মানবতাবাদী প্রভাব
একই সময়ে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে সুফি-ফকিরি সাধকরা আগমন করেন। ইসলামের এই মরমিবাদী ধারাটি স্থানীয় সমাজে দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করে। সুফিদের মূলমন্ত্র ছিল ইশকে এলাহি বা আল্লাহর প্রতি গভীর প্রেম। তাদের মানবতাবাদী চিন্তা, ভেদাভেদহীন সমাজ, দরবেশি জীবনযাপন এবং রীতিনীতিহীন আল্লাহভক্তি স্থানীয় লোকধারার সঙ্গে মিশে যায়। বাউলদের ফকিরি বেশ, দরবেশি চলন, গানের মাধ্যমে গুরুকে স্মরণ (মুর্শিদ-তত্ত্ব) এবং আল্লা-নবী-পরমাত্মাকে দেহস্থ রূপে দেখার প্রবণতা সরাসরি সুফি-ফকিরি ধারার অবদান। এই ধারাই বাউলদের হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় গণ্ডি ভাঙতে বিশেষভাবে সাহায্য করেছে।
গ. বৈষ্ণব সহজিয়া ও প্রেমভক্তির ধারা
ষোড়শ শতকে শ্রীচৈতন্যদেবের মহাভাব এবং প্রেমভক্তি আন্দোলন বাংলার জনমানসে এক বৈপ্লবিক আবেগ সৃষ্টি করে। বৈষ্ণবদের মাধুর্য–রস, রাধাকৃষ্ণের লীলাভাব এবং প্রেমকে ঈশ্বরপ্রাপ্তির একমাত্র পথ হিসেবে দেখা—এসবই বাউলসাধনার সঙ্গে গভীরভাবে মিশে যায়। বৈষ্ণব সহজিয়ারা রাধা-কৃষ্ণের প্রেমকে দেহের মাধ্যমেই অনুভব করতে চেয়েছিলেন। বাউলদের গান ও পদাবলীতে ‘বিরহ’ এবং ‘সাধন সঙ্গিনী’র ধারণা বৈষ্ণব সহজিয়া দর্শন থেকে অনুপ্রাণিত।
সহজিয়া–সুফি–বৈষ্ণব—এই তিন ধারার মিলিত স্রোতে গড়ে ওঠে বাউলধারা, যা ধর্মীয় গণ্ডিকে অতিক্রম করে এক সর্বজনীন মানবধর্মের রূপে বাংলার সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই কারণেই বাউল সাধনাকে বলা হয় ‘ত্রিস্রোত-সমাগম’।
২. বাউলদর্শনের মূল ভিত্তি : দেহতত্ত্ব, মানববাদ ও মনের মানুষ
বাউলদর্শনকে সঠিকভাবে বুঝতে হলে তার তিনটি অপরিহার্য ভিত্তিকে বিশ্লেষণ করা জরুরি: দেহতত্ত্ব, মানববাদ এবং ‘মনের মানুষে’র সন্ধান।
দেহতত্ত্ব : মানবদেহই সত্য লীলাক্ষেত্র
বাউলদের দর্শন মূলত দেহতত্ত্ব বা ‘কায়া-সাধনা’-এর ওপর দাঁড়িয়ে। তারা বিশ্বাস করেন, মানুষের শরীরেই সব আনন্দ–দুঃখ–জ্ঞান–ভক্তির আধার। কোনো দেবতার মূর্তিতে বা দূরবর্তী স্বর্গে ঈশ্বরের সন্ধান নেই; মানবদেহেই নিহিত রয়েছে “পরম মানুষ” বা “মনের মানুষ”। বাউলের দেহতত্ত্বকে বিশ্লেষণ করা যায় নিম্নোক্তভাবে:
মানববাদ : সব ভেদাভেদের ঊর্ধ্বে মানুষধর্ম
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো সর্বজনীন মানববাদ। বাউলরা মানুষকে ধর্ম, জাতপাত, লিঙ্গ, সম্পদ ইত্যাদি সকল ভেদাভেদ থেকে মুক্ত দেখতে চান। তাদের কাছে মানুষের ভেতরের প্রেম ও সরলতাই ধর্ম।
“জাত গেল জাত গেল বলে একি আজব কারখানা। / সত্য কাজে কেউ নয় রাজি, সব দেখি আজ ভাজিখানা।” – লালন শাহ
বাউলরা তথাকথিত ‘গুরুবাদী’ বা ‘শাস্ত্রবাদী’ ধর্মগুলোর তীব্র সমালোচক। তারা মনে করেন, শাস্ত্র বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে। তাদের কাছে মানুষের হৃদয়ের সরল প্রেম, দয়া এবং মানবিকতা হলো সবচেয়ে বড় ধর্ম। এই মানবধর্মই বাউলদের সবচেয়ে বড় অবদান—যা ধর্মীয় সংঘাতপূর্ণ পরিবেশে এক শান্তি ও সহাবস্থানের বাণী ছড়িয়ে দিয়েছে।
মনের মানুষ ও অচিন পাখি
বাউল চিন্তার সবচেয়ে রহস্যময় এবং কেন্দ্রীয় ধারণা হলো ‘মনের মানুষ’ বা ‘অচিন পাখি’র তত্ত্ব। এই ‘মনের মানুষ’ হলো মানবদেহের ভেতরে অবস্থানকারী সেই পরমাত্মা বা সহজ সাঁই, যিনি সব সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকেন।
বাউল সংগীত কেবল গান নয়; এটি বাউলদের সাধনা-পদ্ধতির একটি মৌখিক দলিল। এর সুর, ছন্দ এবং বাণী বাউলদর্শনের গভীরতা বহন করে।
সুর ও বাদ্যের বিশেষত্ব
বাউল সংগীতের বিশেষত্ব মূলত তার সাধনাধর্মী উচ্ছ্বাস, লোকজ সুরভিত্তিক সাদামাটা গীতি–ছন্দ, এবং দেহতত্ত্ব–মানবভক্তির ব্যাখ্যার মধ্যেই নিহিত।
বাণীর গূঢ়তা ও প্রতীকী ভাষা
বাউল গানের বাণী লোকজ ও গ্রাম্য সরলতায় ভরা হলেও অর্থগতভাবে অত্যন্ত গভীর এবং প্রতীকী ভাষার আশ্রয় নেয়।
বাংলার বাউলধারার সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা নিঃসন্দেহে ফকির লালন শাহ (১৭৭৪–১৮৯০)। তিনি বাউল দর্শনকে এমন গভীরতা, ঈষৎ রহস্যময়তা এবং মানবধর্মের যে সার্বজনীন ব্যাখ্যা দিয়েছেন, তা তাকে পৃথক এক উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
৪.১. লালন : সংশ্লেষ এবং স্বাতন্ত্র্য
লালন ছিলেন একাধারে বাউল কবি, গীতিকার এবং সমাজ-সংস্কারক। তিনি কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম–শাস্ত্র বা প্রতিষ্ঠান মানেননি; তার রচনার কেন্দ্রীয় বিষয় মানুষ।
তিনি মানুষকে শেখান—ঈশ্বরকে দূরবর্তী উপাসনালয়ে নয়, বরং মনের মধ্যেই খুঁজতে হবে।
লালনের গানের দার্শনিক গভীরতা
লালনের গানের ভাষা গ্রাম্য সরলতায় ভরা হলেও, তার দার্শনিক বক্তব্য ছিল সে সময়ের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক ও প্রগতিশীল।
বাউলধারার সামাজিক প্রভাব ছিল গভীর ও বহুমাত্রিক। এটি কেবল গ্রামীণ লোকসমাজকে নয়, বরং পুরো বাঙালি সমাজ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করেছে।
সমাজ-সংস্কার ও ভেদাভেদ বিলুপ্তি
বাংলার গ্রামীণ সমাজে ব্রাহ্মণ্যবাদ, জাতিবর্ণ–ভেদ, নারীর ওপর দমন–নিপীড়ন, দরিদ্র–ধনী বিভাজন ইত্যাদি দীর্ঘদিন প্রকট ছিল।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে যখন শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজ লোকায়ত সংস্কৃতি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল, তখন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাউল গানকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন।
পল্লীকবি জসীম উদ্দীন, উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য, ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মযহারুল ইসলাম প্রমুখ বাউল সাহিত্য সংগ্রহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তারা বাউলদের গানের পাণ্ডুলিপি, সাধনার বিবরণ এবং জীবনী সংরক্ষণ করে এই ধারাকে একাডেমিক গবেষণার বিষয় করে তোলেন।
আজকের এই বিশ্বায়িত ও সংঘাতপূর্ণ সময়ে বাউলদর্শনের মানবিকতাবাদ, সহাবস্থান এবং ভেদাভেদহীন মানবপ্রেমের বাণী আরও বেশি প্রয়োজন। এই ধারা শুধু অতীতের উত্তরাধিকার নয়; আধুনিক মানুষকে নতুন করে ভাবতে, নিজের ভেতরের সহজ মানুষটিকে খুঁজে পেতে বাউলধারা আজও এক চিরন্তন আহ্বান জানায়। বাংলার মাটি ও মানুষের এই জীবনদর্শন যতদিন থাকবে, ততদিন বাউল সুর বাজতে থাকবে।