– মোঃ আব্দুল আউয়াল।
মানুষের অস্তিত্বকে যা আলাদা করে, যা তাকে কেবল দেহ বা বুদ্ধি নয়, সম্পূর্ণ এক মানবিক সত্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে, তা হলো তার চেতনা। ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, নৈতিকতা—এসবের সমন্বয়ে মানুষের অন্তর্গত যে আলোকপ্রবাহ জন্ম নেয়, আমরা তাকে বলি চেতনা। এই চেতনা মানুষের ন্যায়বোধ, স্বাধীন চিন্তা, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতার প্রধান উৎস। কিন্তু আধুনিক বিশ্বের জটিল বাজারব্যবস্থা ও তথ্যনির্ভর জীবনযাত্রায় এই মূল্যবান চেতনাই ক্রমে এমন এক ‘উৎপাদনশীল সম্পদে’ পরিণত হয়েছে, যাকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, বিক্রি করা যায়, এমনকি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লাভের জন্য যথেচ্ছ ব্যবহারও করা যায়। প্রশ্ন হলো—এমন কী ঘটেছে যে মানুষের বিবেক, নৈতিকতা ও মূল্যবোধও এখন বাজারের অদৃশ্য নিলামে ওঠে?
আসলে চেতনার বাণিজ্য নতুন কিছু নয়। ইতিহাসের প্রতিটি যুগে ক্ষমতাকেন্দ্রগুলি মানুষের বিশ্বাসকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু প্রযুক্তি-চালিত ২১শ শতকে এই নিয়ন্ত্রণের ধরন বদলে গেছে। এখন প্রচারণা শুধু ভাষা বা ভাবনার ওপর নয়; মানুষের মনস্তত্ত্ব, আচরণ ও আবেগের ওপরও নির্দিষ্ট কৌশলে প্রয়োগ করা হচ্ছে। রাজনীতি থেকে কর্পোরেট জগৎ—সবখানেই চেতনা হয়ে উঠেছে এক অদৃশ্য সম্পদ। রাজনৈতিক দলগুলো জানে, মানুষের চেতনা যদি আবেগে আবদ্ধ করা যায়, তবে যুক্তিকে নির্বাসিত করা সহজ। সুতরাং নির্বাচনী প্রচারণা, প্রভাবশালী প্রচারমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম—সবই মানুষের চেতনা দখলের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত।
কর্পোরেট পৃথিবীও একই খেলায় মত্ত। বিজ্ঞাপনের ভাষা এখন আর শুধু পণ্য বিক্রির ভাষা নয়; এটি মানুষের চেতনা গঠনের মাধ্যম। মানুষকে বোঝানো হচ্ছে—একটি নির্দিষ্ট পণ্য কিনলেই সে আধুনিক, উন্নত, স্বাধীন কিংবা প্রগতিশীল। তার রুচি, আনন্দ, জীবনযাত্রা সবকিছুই যেন পণ্যের মাধ্যমে তার পরিচিতির অংশ হয়ে উঠছে। মানুষের চেতনার ওপর এই প্রভাব অদৃশ্য হলেও গভীর, এবং দীর্ঘ সময়ে তা ব্যক্তিত্বকে এমনভাবে গঠন করে যে মানুষ নিজের আসল চেতনাকে ভুলে গিয়ে বাজারের তৈরি পরিচয়কে গ্রহণ করে।
চেতনা বিক্রির পেছনে ব্যক্তিগত কারণও রয়েছে। অর্থনৈতিক সংকট, জীবিকার অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ এবং ক্ষমতাপ্রাপ্তির লোভ অনেককে নিজের নৈতিক অবস্থান পরিত্যাগে প্ররোচিত করে। কেউ অভাবের তাড়নায়, কেউ সুবিধার আকাঙ্ক্ষায়, আবার কেউ নিরাপদ স্রোতে ভেসে থাকার প্রবণতায় নিজের চেতনাকে ক্ষয়িষ্ণু করে তোলে। চেতনাহীনতা তখন স্বাভাবিক আচরণে পরিণত হয়; মানুষ নিজেকে বুঝতেই পারে না যে সে নিজস্ব সত্তা থেকে বিচ্যুত হয়ে অন্যের স্বার্থ পূরণের উপকরণে পরিণত হয়েছে। এই বিচ্যুতি ব্যক্তিকে সাময়িক লাভ দিলেও এর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি অপরিবর্তনীয়। বিবেকের ভেতরে এক ধরনের শূন্যতা জন্মায়, আত্মসম্মান ভেঙে যায়, বিচারবোধ দুর্বল হয়, আর নৈতিক কাঠামো ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। ব্যক্তি তখন নিজেকে আর নিজের মতো মনে করেন না।
তবে সমস্যা শুধু ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যখন একটি সমাজে ব্যাপক পরিসরে চেতনা বিক্রি শুরু হয়, তখন সেখানে দুর্নীতি স্বাভাবিক, স্বজনপ্রীতি সামাজিক নিয়ম, নৈতিকতা কথার অলঙ্কার, আর মূল্যবোধ কাগুজে শ্লোগানে পরিণত হয়। এমন সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না; সত্য ও অসত্যের সীমানা মিলেমিশে যায়; মানুষ নিজের স্বার্থকে সমাজের স্বার্থের ওপরে স্থান দেয়। ধীরে ধীরে সামাজিক আস্থা ভেঙে পড়ে, নাগরিকদের মধ্যে বিশ্বাসের সংকট তৈরি হয়, এবং একটি নৈতিক-দুর্বলতা সম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে ওঠে। চেতনার অবক্ষয় যত গভীর হয়, সমাজ তত দুর্বল হয়।
রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও ক্ষতিটি সুদূরপ্রসারী। সচেতন নাগরিকই একটি রাষ্ট্রের মূল শক্তি। যখন নাগরিকরা নিজের চেতনার ওপর দাঁড়াতে পারে না, তারা প্রশাসনিক অবিচার মেনে নেয়, দুর্নীতি দেখে চুপ থাকে, ক্ষমতার অপব্যবহার দেখেও কোনও প্রতিরোধ গড়ে তোলে না। এভাবেই রাষ্ট্রীয় কাঠামো দুর্বল হয়, গণতন্ত্র ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় এবং রাষ্ট্র তার মৌলিক লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হতে থাকে। একটি জাতির পতনের সূচনা হয় নাগরিকদের চেতনার পতন থেকেই—এ কথা ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে।
তাই প্রশ্ন হলো—চেতনা রক্ষা কীভাবে সম্ভব? চেতনা রক্ষার পথ কঠিন, কিন্তু একমাত্র কার্যকর পথ হলো আত্মসমালোচনার অনুশীলন, সত্যনিষ্ঠতা, জ্ঞান ও তথ্য যাচাই করার অভ্যাস, ভিন্নমতকে সহনশীলভাবে গ্রহণ, মানবিক মূল্যবোধের চর্চা এবং স্বাধীন চিন্তাকে সাহসের সঙ্গে রক্ষা করা। চেতনা কখনো স্থির নয়; এটি ক্রমাগত চর্চার মাধ্যমে জাগ্রত রাখতে হয়। নিজের অভ্যন্তরীণ শক্তিকে জাগিয়ে তোলা এবং সৎ সিদ্ধান্তের প্রতি দায়বদ্ধতাই মানুষকে চেতনার দৃঢ়তায় নিয়ে যায়।
বিশ্বায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের এই পরিবর্তনশীল সময়ে চেতনা রক্ষা করা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কঠিন। কিন্তু কঠিন বলেই তা অপ্রয়োজনীয় নয়। বরং চেতনার স্বাধীনতা আজকের মানবসভ্যতার বেঁচে থাকার অন্যতম শর্ত। মানুষের প্রকৃত শক্তি তার সম্পদ নয়, তার জ্ঞান নয়, তার প্রযুক্তি নয়—তার চেতনা। এই চেতনা যদি বিক্রি হয়ে যায়, তবে মানুষ হারাবে নিজের মূল পরিচয়, আর সমাজ হারাবে ন্যায় ও মানবতার ভবিষ্যৎ।
অতএব বলা যায়, চেতনা কোনো বাজারজাত পণ্য নয়; এটি মানবতার ভিত্তি, মানুষের আত্মমর্যাদার মর্মকেন্দ্র। চেতনা রক্ষা মানে ভবিষ্যৎ রক্ষা—সমাজ, রাষ্ট্র এবং মানবজীবনের অগ্রগতির রক্ষা। এই সত্যটি যতদিন ব্যক্তি ও সমাজ উপলব্ধি করতে পারবে, ততদিন মানবসভ্যতার আলো নিভে যাবে না।