|রুশাইদ আহমেদ, বেরোবি|
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (ব্রাকসু) নির্বাচনের সকল কার্যক্রম হঠাৎ অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। সোমবার (০১ ডিসেম্বর) বিকাল সাড়ে চারটার দিকে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে কমিশন প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সহযোগিতা না পাওয়ার অভিযোগে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভুল তথ্য সরবরাহের কারণে সুষ্ঠু নির্বাচনি প্রক্রিয়া পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে না জানিয়ে এই সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে।
জানা যায়, ব্রাকসু নির্বাচন উপলক্ষে প্রণীত ভোটারদের তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভর্তি বাতিল করে যাওয়া কিছু শিক্ষার্থীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সঙ্গে নারীদের শহীদ ফেলানী হলে কয়েকজন পুরুষ শিক্ষার্থীকে ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার অভিযোগ ওঠে। ২৫ নভেম্বর থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের অব্যাহতি চাওয়া নিয়েও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়। গত শনিবার (২৯ নভেম্বর) তিনি পুনরায় দায়িত্ব পালন করবেন বলে পুনরায় গুঞ্জন ওঠে।
এতদসত্ত্বেও গত রবিবার (৩০ নভেম্বর) তফসিলে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে তিন দিন পরে মনোনয়ন ফরম বিতরণ শুরু করে নির্বাচন কমিশন। প্রথম দিন আশানুরূপ মনোনয়ন ফরম সংগ্রহের দৃশ্য চোখে না পড়লেও পরদিন সোমবার (০১ ডিসেম্বর) সকাল থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা দলে দলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের উপ-উপাচার্যের দপ্তর হতে মনোনয়ন সংগ্রহ করা শুরু করেন।
বিকাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক বেশ কয়েকজন সমন্বয়ক ব্রাকসুর বিভিন্ন পদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। তবে এর আগে, বেলা একটার দিকে ব্রাকসুর শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক পদে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়ন সংগ্রহ করতে গিয়ে ভোটার তালিকায় নাম না থাকার কথা গণমাধ্যমকে জানান ফাইন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ইন্দ্রাণী মুখার্জি।
ইন্দ্রাণী গণমাধ্যমকে বলেন, আমি ব্রাকসুর শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক পদে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মনোনয়ন সংগ্রহ করতে আসছি। কিন্তু এখানে (বিদ্যমান) ভোটার তালিকায় আমার নাম নেই। অথচ সফট কপিতে আমার নাম ছিল। এটা এক ধরনের (প্রশাসনিক) অব্যবস্থাপনা মনে হচ্ছে আমার কাছে।
এ ঘটনার পরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের শাখা জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতৃবৃন্দ মনোনয়ন ফরম বিতরণের স্থানে যান “ভোটার তালিকায় অসঙ্গতি থাকা এবং তড়িঘড়ি করে ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের” অভিযোগ তুলে। সে সময়, তাদের তোপের মুখে পড়েন নির্বাচন কমিশনের প্রধান কমিশনারসহ অন্য সদস্যরা। ছাত্রদল নেতৃবৃন্দ ভোটার তালিকা সংশোধন এবং যৌক্তিক সময় নিয়ে নির্বাচন আয়োজন না করলে নির্বাচন বয়কটের হুঁশিয়ারি দেন।
এরপরও বিকাল পর্যন্ত ব্রাকসু নির্বাচনে প্রার্থিতা করতে আগ্রহীদের মাঝে মনোনয়ন ফরম বিতরণ করা হয়। পরে হঠাৎ বিকেল পাঁচটার দিকে এক প্রেস ব্রিফিং ডেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ব্রাকসু নির্বাচনের সকল কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণা দেয় নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের দিকে আঙুল তুলে বলে, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক অসহযোগিতা এবং বিভিন্ন স্তর থেকে ভোটার তালিকা সংক্রান্ত ভুল তথ্য প্রেরণের কারণে নানা সমস্যা দেখা দেওয়ায় অনির্দিষ্টকালের জন্য ব্রাকসু নির্বাচনের সকল কার্যক্রম স্থগিতের ঘোষণা দেওয়া হলো। পাশাপাশি, সকল স্তর থেকে সার্বিক সহযোগিতা করা হলে নির্বাচন আয়োজনের কার্যক্রম আবার শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করে কমিশন।
এ দিকে, নির্বাচন স্থগিতের ঘোষণা আসার পরপরই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ এই ক্যাম্পাসে সাবেক সমন্বয়ক, সাধারণ শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন প্যানেলের সদস্যদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ে শাখা ছাত্রদল নেতারা। প্রশাসনিক ভবনের দক্ষিণ ফটকের সামনে অবস্থানরত শিক্ষার্থীদের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে এক পর্যায়ে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলানোর হুমকি দেন। এ সময়, সাবেক সমন্বয়ক প্যানেল ও ছাত্রদল নেতাকর্মীদপর মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে। পরে প্রশাসনের মধ্যস্থতায় দু’পক্ষ সংযত হয়।
এরপর সন্ধ্যায় জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ শওকাত আলী বলেন, “যথা সময়ে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। কোথায় সমস্যা হয়েছে তা আমরা খতিয়ে দেখছি।” নির্বাচনে অসহযোগিতার দায় কার জানতে চাইলে তিনি জানান, বিষয়টি নির্বাচন কমিশন ও রেজিস্ট্রার অফিসের কাছে জানতে হবে। তিনি আরও বলেন, ভোটার তালিকা নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে তা সমাধানে প্রশাসন দ্রুত কাজ করছে।
এ দিকে, নির্বাচন স্থগিতের ঘোষণা ও পরবর্তী অস্থিরতা ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। সকল সমস্যার দ্রুত সমাধান শেষে নির্ধারিত সময়ে নির্বাচন আয়োজনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করছেন শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহ-সভাপতি মো. তুহিন রানা গণমাধ্যমকে বলেন, কোনো ধরনের অসঙ্গতি রেখে ব্রাকসু নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান। এরপরও একটা গোষ্ঠী প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। আমরা তা প্রতিহত করেছি।
সাবেক সমন্বয়ক মো. আশিকুর রহমান বলেন, অনতিবিলম্বে নির্বাচনের কার্যক্রম পুনরায় শুরু করতে হবে। এটা নিয়ে কোনো তালবাহানা চলবে না। প্রয়োজনে প্রশাসন বসে সিদ্ধান্ত নেবে কীভাবে সমাধান করা যায়। সমাধান না করলে প্রশাসনিক ব্যক্তিবর্গকে অবরুদ্ধ করে রাখারও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
এর আগে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সংগঠক মো. শামসুর রহমান কমিশনের এই সিদ্ধান্তকে “প্রহসন” আখ্যা দিয়ে বলেন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণের দাবির চূড়ান্ত পরিণতি হিসেবে ব্রাকসু নির্বাচন আয়োজনের পথে আমরা যখন এগিয়ে যাচ্ছি, তখন নির্বাচন কমিশনের এই উদ্যোগ এক ধরনের প্রহসন ও ছেলেখেলা। ব্রাকসু নির্বাচন বানচালের অপচেষ্টা চালানো এ ধরনের বিভিন্ন গোষ্ঠী এক হলেও তাদের সাধারণ শিক্ষার্থীরা প্রতিহত করবে বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন তিনি।