-মোঃ আব্দুল আউয়াল।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
গ্রাম থেকে শহরে মানুষের নিরবচ্ছিন্ন স্রোত যেন আমাদের সময়ের সবচেয়ে নীরব অথচ গভীর এক আর্তনাদ। এই যাত্রা শুধু ভৌগোলিক স্থানান্তর নয়, এটি জীবনের দর্শন, স্বপ্ন, পরাজয় ও আশাভঙ্গের এক দীর্ঘ উপাখ্যান। কেউ একে উন্নয়নের স্বাভাবিক ধারা বলে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন, আবার কেউ একে দেখেন সামাজিক বিপর্যয়ের অশনি সংকেত হিসেবে। প্রশ্নটি তাই সরল নয়—গ্রাম থেকে শহরে পালায়ন কি সত্যিই উন্নয়ন, নাকি এটি আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার ব্যর্থতার সবচেয়ে জোরালো স্বীকারোক্তি?
গ্রাম ছিল একসময় জীবনের কেন্দ্র। মাটির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক ছিল আত্মীয়তার মতো—নীরব, গভীর ও অবিচ্ছেদ্য। নদী, মাঠ, গাছ, ফসল আর মানুষ মিলিয়ে গ্রাম ছিল একটি চলমান সংস্কৃতি, যেখানে জীবন কেবল জীবিকার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল না। সেখানে ছিল সামাজিক বন্ধন, পারস্পরিক দায়বদ্ধতা, আনন্দ-বেদনার যৌথ অভিজ্ঞতা। কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা, বাজার অর্থনীতি ও কেন্দ্রীভূত উন্নয়ন দর্শন ধীরে ধীরে গ্রামকে ঠেলে দিয়েছে প্রান্তে। উন্নয়নের মানচিত্রে শহর হয়ে উঠেছে আলোকিত কেন্দ্র, আর গ্রাম—অন্ধকারে ঢাকা এক পশ্চাৎপট।
এই পালায়নের পেছনে সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। কৃষিনির্ভর জীবিকা আর আগের মতো নিশ্চিত নয়। জমি কমছে, উৎপাদন খরচ বাড়ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত গ্রামকে করছে আরও অনিরাপদ। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা—এসব এখন আর ব্যতিক্রম নয়, বরং নিয়মিত বাস্তবতা। একজন কৃষক যখন বছরের পর বছর পরিশ্রম করেও ন্যায্য দাম পান না, যখন ঋণের বোঝা তার ঘাড়ে চেপে বসে, তখন শহরের দিকে তাকানো ছাড়া তার আর কীই বা থাকে? শহর তার কাছে স্বপ্ন নয়, শেষ আশ্রয়।
শিক্ষাও এই পালায়নের একটি বড় অনুঘটক। গ্রামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকলেও মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, দক্ষ শিক্ষক—সবকিছুর অভাব প্রকট। অভিভাবকরা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে শহরের দিকে পা বাড়ান। শহর যেন হয়ে ওঠে সম্ভাবনার প্রতিশ্রুতি—ভালো স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কোচিং সেন্টার। কিন্তু এই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তব, সে প্রশ্ন অনেক সময় অনালোচিতই থেকে যায়।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। গ্রামে চিকিৎসা মানে প্রায়ই সীমিত সুযোগ, অপ্রতুল সরঞ্জাম, কখনো কখনো অবহেলা। গুরুতর অসুস্থতা দেখা দিলে শহরমুখী হওয়া ছাড়া বিকল্প থাকে না। ফলে মানুষ ধীরে ধীরে বুঝে নেয়—বাঁচতে হলে শহরের কাছাকাছি থাকাই নিরাপদ। এই ‘নিরাপত্তা’ বোধই গ্রাম ছাড়ার সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত করে।
কিন্তু শহর কি সত্যিই সেই স্বপ্নের জায়গা? শহরে পা রাখার পর বাস্তবতা অনেক সময় নির্মমভাবে আঘাত করে। অস্থায়ী বাসস্থান, বস্তি, নিম্নমানের জীবনযাত্রা, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ—এসবই শহুরে বাস্তবতার অংশ। যে মানুষটি গ্রামে নিজের জমিতে চাষ করত, সে শহরে হয়ে ওঠে রিকশাচালক, দিনমজুর, গার্মেন্টস শ্রমিক। তার জীবনে আয় হয়তো নগদে আসে, কিন্তু জীবনের মান কি সত্যিই উন্নত হয়? প্রশ্নটি সহজ নয়।
শহরের অবকাঠামো এই বিপুল জনস্রোত ধারণ করার জন্য প্রস্তুত ছিল না। ফলে তৈরি হচ্ছে যানজট, দূষণ, পানির সংকট, আবাসন সমস্যা। শহর যেন নিজেই এক ক্লান্ত দানবে পরিণত হয়েছে—যে মানুষকে টেনে নেয়, কিন্তু পরিপূর্ণ আশ্রয় দিতে পারে না। গ্রাম থেকে আসা মানুষ শহরের অর্থনীতিকে সচল রাখে, কিন্তু তারাই থাকে সবচেয়ে প্রান্তিক অবস্থানে। উন্নয়নের সুফল তাদের জীবনে পৌঁছায় খুব সামান্যই।
এই পালায়নের ফলে গ্রামও শূন্য হতে থাকে। কর্মক্ষম তরুণেরা চলে গেলে গ্রামে থেকে যায় বৃদ্ধ, নারী ও শিশু। কৃষিকাজে শ্রমিক সংকট দেখা দেয়, উৎপাদন কমে যায়। সামাজিক জীবন ভেঙে পড়ে। গ্রাম যে একসময় ছিল প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, তা ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে ওঠে। উৎসবের আনন্দ ম্লান হয়, লোকজ সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে বসে। গ্রাম কেবল একটি ভৌগোলিক স্থান হয়ে থাকে, জীবনের কেন্দ্র আর থাকে না।
এখানে উন্নয়নের ধারণাটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। উন্নয়ন যদি হয় এমন একটি প্রক্রিয়া, যা মানুষকে তার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে, যা একটি অঞ্চলের প্রাণশক্তি শুষে নিয়ে অন্যত্র সঞ্চিত করে, তবে সেই উন্নয়ন কতটা মানবিক? শহরের ঝলমলে আলোয় দাঁড়িয়ে আমরা গ্রাম থেকে শহরে আসা মানুষদের সংখ্যা দিয়ে উন্নয়নের হিসাব করি, কিন্তু এই সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে থাকা গল্পগুলো কি আমরা শুনি?
অনেকে বলেন, এটি শিল্পায়নের স্বাভাবিক ধারা। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, শিল্পবিপ্লবের সময় ইউরোপেও গ্রাম থেকে শহরে মানুষ গিয়েছে। কিন্তু পার্থক্য হলো—সেখানে শিল্পায়নের সঙ্গে সঙ্গে গ্রামেও বিনিয়োগ হয়েছে, কৃষিকে আধুনিক করা হয়েছে, সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। আমাদের ক্ষেত্রে শহরমুখী উন্নয়ন অনেক সময় একপাক্ষিক। গ্রামকে রেখে শহর এগোয়, গ্রামকে সঙ্গে নিয়ে নয়।
এই পালায়ন মানসিকতাকেও বদলে দেয়। গ্রাম থেকে আসা মানুষ শহরে নিজের পরিচয় লুকাতে শেখে। গ্রাম যেন লজ্জার বিষয় হয়ে ওঠে। শহুরে সংস্কৃতিতে গ্রামীণ পরিচয়কে অবমূল্যায়ন করা হয়। ফলে এক ধরনের সাংস্কৃতিক সংকট তৈরি হয়—মানুষ তার শিকড় ভুলতে বসে, অথচ নতুন পরিচয়ও পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারে না। এই দ্বন্দ্ব তার আত্মপরিচয়ে ফাটল ধরায়।
শিশুরা এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে নীরব ভুক্তভোগী। বস্তিতে বেড়ে ওঠা শিশুরা না পায় গ্রামের মুক্ত প্রকৃতি, না পায় শহরের নিরাপদ শৈশব। তাদের শৈশব কেটে যায় সংকীর্ণ গলিতে, দূষিত পরিবেশে। শিক্ষা তাদের জন্যও হয়ে ওঠে অনিশ্চিত। ফলে একটি প্রজন্ম ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে সম্ভাবনার সীমাবদ্ধতা নিয়ে।
গ্রাম থেকে শহরে পালায়ন নারীদের জীবনেও দ্বিমুখী প্রভাব ফেলে। একদিকে শহর নারীদের জন্য নতুন কাজের সুযোগ তৈরি করে, বিশেষ করে গার্মেন্টস শিল্পে। অন্যদিকে এই কাজগুলো প্রায়ই কম মজুরি, দীর্ঘ শ্রমঘণ্টা ও অনিরাপদ পরিবেশে আবদ্ধ। গ্রামে যে সামাজিক সুরক্ষা ছিল, শহরে তা অনেক সময় ভেঙে পড়ে। নারী হয়ে ওঠে আরও বেশি ঝুঁকির মুখে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি সত্যিই বিকল্পহীন? উত্তর হলো, না। বিকল্প আছে, কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। গ্রামকে কেবল কৃষির জায়গা হিসেবে দেখলে চলবে না। গ্রাম হতে পারে বহুমাত্রিক অর্থনৈতিক কেন্দ্র—কৃষিভিত্তিক শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, পর্যটন, প্রযুক্তিনির্ভর কাজ—সবকিছুর সম্ভাবনা সেখানে রয়েছে। প্রয়োজন অবকাঠামো, প্রশিক্ষণ ও নীতিগত সহায়তা।
ডিজিটাল প্রযুক্তি এই ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। ইন্টারনেট ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতির মাধ্যমে গ্রাম থেকেই অনেক কাজ করা সম্ভব। কিন্তু প্রযুক্তি একা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসিক পরিবর্তন—গ্রামে থাকা মানেই পিছিয়ে থাকা নয়, এই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করা।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাকে গ্রামকেন্দ্রিক করতে হবে। শুধু ভবন নয়, মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষক ও চিকিৎসকদের জন্য গ্রামে কাজ করা যেন সম্মানের ও নিরাপদ হয়, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তাহলে মানুষ বাধ্য হয়ে শহরে ছুটবে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষকে রাখা। উন্নয়ন যেন পরিসংখ্যানের খেলা না হয়ে ওঠে, বরং জীবনের মানের প্রশ্নে দাঁড়ায়। গ্রাম থেকে শহরে পালায়ন যদি মানুষের মুক্ত পছন্দ হয়—ভালো জীবনের আকর্ষণে—তবে তা উন্নয়নের লক্ষণ হতে পারে। কিন্তু যদি তা হয় বেঁচে থাকার তাগিদে, বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্ত হিসেবে, তবে তা নিঃসন্দেহে বিপর্যয়।
এই পালায়নের স্রোত আমাদের আয়নায় দাঁড় করায়। আমরা কী ধরনের রাষ্ট্র, কী ধরনের সমাজ গড়ে তুলছি—এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে এই যাত্রার ভেতরেই। শহরের আলো যতই উজ্জ্বল হোক, যদি তার উৎস হয় গ্রামের অন্ধকার, তবে সেই আলো দীর্ঘস্থায়ী হয় না। টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে হলে গ্রাম ও শহরের মধ্যে এই বৈষম্য ভাঙতেই হবে।
গ্রাম থেকে শহরে পালায়ন তাই কোনো একক অর্থ বহন করে না। এটি একই সঙ্গে উন্নয়নের আকাঙ্ক্ষা ও ব্যর্থতার দলিল। এর ভেতর আছে স্বপ্ন, আবার আছে হাহাকার। এই দ্বন্দ্বকে অস্বীকার করে নয়, বরং স্বীকার করেই আমাদের সামনে এগোতে হবে। এমন এক উন্নয়নের পথে, যেখানে মানুষ পালায় না—নিজের জায়গাতেই সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে।