
মোঃ আব্দুল আউয়াল
অধ্যক্ষ ও শিক্ষা গবেষক।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
কাজী নজরুল ইসলামকে আমরা মূলত বিদ্রোহের কবি, সাম্যের কবি, প্রেম ও মানবতার কবি হিসেবেই জানি। তাঁর কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও সাংবাদিকতা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের রাজনৈতিক ও সামাজিক চেতনাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। কিন্তু নজরুলের জীবনের এমন একটি অধ্যায় রয়েছে, যা তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়ের আড়ালে অনেকটাই অনালোচিত—তিনি একসময় নিজেই নির্বাচনের মাঠে নেমেছিলেন। ১৯২৬ সালের ব্রিটিশ ভারতের কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে তাঁর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ ছিল সেই বিরল রাজনৈতিক অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কবিতা ও গানের মাধ্যমে যে মানুষটি শোষণ, সাম্প্রদায়িকতা ও ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, তিনিই একসময় আইনসভার ভেতর থেকে মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলার প্রত্যাশায় ভোটের রাজনীতিতে প্রবেশ করেছিলেন।
নজরুলের রাজনীতিতে প্রবেশ অবশ্য ১৯২৬ সালে হঠাৎ ঘটেনি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যাচ্ছিল। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, অসহযোগ, স্বরাজের দাবি এবং কৃষক-শ্রমিকের অধিকার নিয়ে নতুন রাজনৈতিক চেতনার উন্মেষ ঘটছিল। সৈনিকজীবন শেষে কলকাতায় ফিরে নজরুল সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সক্রিয় রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। পরে ‘লাঙল’ ও ‘গণবাণী’র মতো পত্রিকার মাধ্যমে তিনি কৃষক-শ্রমিকের অধিকার, সামাজিক সাম্য এবং ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করেন।
চিত্তরঞ্জন দাশের মৃত্যু ১৯২৫ সালে বাংলার রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। তাঁর নেতৃত্বে স্বরাজ্যবাদী রাজনীতি যে শক্তি অর্জন করেছিল, তাঁর মৃত্যুর পর সেখানে দেখা দেয় নেতৃত্বের সংকট। একই সময়ে বাংলার হিন্দু-মুসলমান সম্পর্কও ক্রমশ উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠছিল। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিস্তার নজরুলকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছিল। তিনি ধর্মীয় বিভাজনের বিপরীতে মানুষের ঐক্যের কথা বলেছেন বারবার। তাঁর কবিতা ও গানে যেমন ইসলামী ভাবধারার প্রকাশ ঘটেছে, তেমনি হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্য ও শ্যামাসংগীতের সুরও তিনি গ্রহণ করেছেন। তাঁর কাছে মানুষের পরিচয় ধর্মীয় পরিচয়ের সংকীর্ণতার চেয়ে বড় ছিল।
এই রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেই ১৯২৬ সালের নির্বাচনে নজরুল প্রার্থী হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ব্রিটিশ ভারতের কেন্দ্রীয় আইনসভার নির্বাচনে ঢাকা বিভাগ থেকে মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত আসনে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। সেই সময়ের নির্বাচনী ব্যবস্থা বর্তমানের সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে পরিচালিত হতো না। ভোটাধিকার ছিল সীমিত এবং নির্দিষ্ট যোগ্যতা, সম্পত্তি ও অন্যান্য শর্তের সঙ্গে তা যুক্ত ছিল। ফলে আজকের অর্থে একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর জনপ্রিয়তা সরাসরি ভোটে প্রতিফলিত হওয়ার সুযোগ ছিল না।
নজরুলের নির্বাচনী এলাকা ছিল যথেষ্ট বিস্তৃত। ঢাকা, ফরিদপুর, বাকেরগঞ্জ ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই নির্বাচনী এলাকার মোট ভোটার ছিলেন ১৮ হাজার ১১৬ জন। এত বড় এলাকায় একজন কবির পক্ষে সংগঠিত রাজনৈতিক কাঠামো ও পর্যাপ্ত অর্থ ছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। নজরুলের নির্বাচনী প্রচারণার অর্থসংকটের কথাও বিভিন্ন জীবনী ও স্মৃতিকথায় এসেছে। প্রচারের জন্য স্বরাজ্য দলের পক্ষ থেকে বিধানচন্দ্র রায় তাঁকে ৩০০ টাকা দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই সামান্য অর্থ নিয়েই তিনি বিশাল নির্বাচনী এলাকায় প্রচারে নামেন।
নজরুলের প্রচারণা ছিল প্রচলিত রাজনৈতিক প্রচারণার তুলনায় একেবারেই আলাদা। তাঁর হাতে ছিল না বড় কোনো নির্বাচনী যন্ত্র, বিপুল অর্থ কিংবা দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সংগঠন। তাঁর প্রধান শক্তি ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব, কবিতা, গান এবং মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের ক্ষমতা। তিনি যেখানে যেতেন, সেখানে রাজনৈতিক বক্তব্যের পাশাপাশি কবিতা আবৃত্তি ও গান মানুষের মধ্যে আলাদা আবেগ সৃষ্টি করত। তাঁর সঙ্গে তরুণ সমাজের একটি অংশও যুক্ত হয়েছিল। পল্লীকবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিচারণে নজরুলের পূর্ববঙ্গ সফর ও মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের নানা চিত্র পাওয়া যায়।
কিন্তু নির্বাচনী রাজনীতি কেবল আবেগের ওপর চলে না। জনসমাগম এবং ভোটারের সংখ্যা এক নয়; কবির জনপ্রিয়তা আর নির্বাচনী সংগঠনও এক বিষয় নয়। নজরুলের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা এই পার্থক্যটি অত্যন্ত স্পষ্ট করে দেয়। তিনি মানুষের ভালোবাসা দেখেছিলেন, কিন্তু ভোটের বাক্সে সেই ভালোবাসা কতটা প্রতিফলিত হবে, তার রাজনৈতিক হিসাব তাঁর কাছে সম্ভবত এতটা পরিষ্কার ছিল না। পরবর্তী স্মৃতিচারণে তাঁর বিপুল ভোট পাওয়ার প্রত্যাশার কথাও পাওয়া যায়। মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ভালোবাসা তাঁকে আশাবাদী করে তুলেছিল।
অন্যদিকে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের অনেকেই ছিলেন সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী। তাঁদের ছিল স্থানীয় প্রভাব, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং প্রতিষ্ঠিত সামাজিক অবস্থান। নজরুলের রাজনৈতিক পুঁজি ছিল মূলত তাঁর আদর্শ, সাহিত্যিক জনপ্রিয়তা ও মানুষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। এই দুই ধরনের রাজনৈতিক শক্তির সংঘর্ষে ফলাফল যে নজরুলের পক্ষে সহজ হবে না, তা নির্বাচনের ফলেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নজরুলের বিরুদ্ধে ধর্মীয় অপপ্রচারের কথাও পরবর্তী বিভিন্ন স্মৃতিচারণ ও লেখালেখিতে পাওয়া যায়। তাঁর অসাম্প্রদায়িক অবস্থান, হিন্দু-মুসলমানের সম্প্রীতির আহ্বান এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ঐতিহ্যকে সাহিত্যে ও সংগীতে ব্যবহারের কারণে রক্ষণশীল মহলের একাংশ তাঁর বিরোধিতা করেছিল। তাঁকে ধর্মীয়ভাবে আক্রমণ করার চেষ্টা হয়েছিল—এমন উল্লেখও বিভিন্ন লেখায় রয়েছে। তবে তাঁর নির্বাচনী পরাজয়ের একমাত্র কারণ হিসেবে ফতোয়া বা ধর্মীয় অপপ্রচারকে চিহ্নিত করা ইতিহাসের জটিল বাস্তবতাকে অতিরিক্ত সরল করে ফেলে। সীমিত ভোটাধিকার, নির্বাচনী এলাকার বিশালতা, অর্থের অভাব, সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের স্থানীয় প্রভাব—সবকিছুর সমন্বিত প্রভাব বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
নির্বাচনের ফলাফল ছিল নজরুলের জন্য হতাশাজনক। ২৯ নভেম্বর ১৯২৬ ফল প্রকাশিত হলে দেখা যায়, তিনি পেয়েছেন ১ হাজার ৬২ ভোট। পাঁচ প্রার্থীর মধ্যে তিনি চতুর্থ হন এবং তাঁর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। যে কবি মানুষের ভালোবাসায় নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছিলেন, তাঁকে শেষ পর্যন্ত কঠিন নির্বাচনী বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়।
কিন্তু এই পরাজয়কে শুধু একজন প্রার্থীর ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে ১৯২৬ সালের ঘটনাটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য ধরা পড়বে না। বরং এই নির্বাচন নজরুলের রাজনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আমাদের সামনে তুলে ধরে। তিনি কেবল দূর থেকে রাজনীতি নিয়ে কবিতা লিখতে চাননি; প্রয়োজন হলে নিজেই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে চেয়েছিলেন। তাঁর কাছে সাহিত্য ছিল সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার, আর রাজনীতি ছিল সেই পরিবর্তনকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করার একটি সম্ভাব্য পথ।
তবে নির্বাচনী রাজনীতির অভিজ্ঞতা সম্ভবত তাঁকে বুঝতে সাহায্য করেছিল যে মানুষের হৃদয়ে জনপ্রিয় হওয়া এবং নির্বাচনী ক্ষমতা অর্জন করা এক বিষয় নয়। সংসদীয় রাজনীতিতে সংগঠন, অর্থ, সামাজিক প্রভাব, নির্বাচনী কৌশল এবং প্রাতিষ্ঠানিক শক্তির গুরুত্ব অপরিসীম। একজন কবির নৈতিক ও সাংস্কৃতিক জনপ্রিয়তা সেই কাঠামোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গেলে নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে পারে।
নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর নজরুল অবশ্য তাঁর রাজনৈতিক চেতনা থেকে সরে যাননি। বরং তাঁর কবিতা, গান ও সাংবাদিকতায় সাম্য, স্বাধীনতা, শ্রমজীবী মানুষের অধিকার, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি এবং শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র শেষ পর্যন্ত আইনসভা হয়ে ওঠেনি; হয়ে উঠেছিল তাঁর কলম, তাঁর কণ্ঠ এবং তাঁর সাংস্কৃতিক সৃষ্টিশীলতা।
এখানেই ১৯২৬ সালের নির্বাচনে নজরুলের অংশগ্রহণের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য। তিনি নির্বাচনে জয়ী হননি, সংসদে গিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার সুযোগও পাননি। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা ও সামাজিক দায়বদ্ধতার পরিচয় এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। তিনি দেখিয়েছিলেন, কবি মানে কেবল সৌন্দর্যের সাধক নন; কবি চাইলে সময়ের রাজনৈতিক সংকটের মধ্যেও নিজেকে সম্পৃক্ত করতে পারেন।
একশ বছর পর সেই নির্বাচনের ফলাফলের দিকে তাকালে সংখ্যাটি হয়তো খুব ছোট—১ হাজার ৬২ ভোট। কিন্তু ইতিহাসের বিচারে নজরুলের গুরুত্ব কোনো নির্বাচনী সংখ্যায় নির্ধারিত হয়নি। তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা নির্বাচনে জয়ী হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁদের রাজনৈতিক সাফল্য সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে গেছে। নজরুলের কবিতা, গান ও চিন্তা বরং সময় অতিক্রম করে আরও বিস্তৃত হয়েছে।
১৯২৬ সালের নির্বাচন তাই নজরুলের জীবনে কোনো বিচ্ছিন্ন বা কৌতূহলোদ্দীপক ঘটনা মাত্র নয়। এটি ছিল এমন এক সময়ের দলিল, যখন একজন কবি মানুষের মুক্তি, সাম্য ও মর্যাদার প্রশ্নকে শুধু কবিতার পাতায় নয়, সরাসরি রাজনীতির মঞ্চেও প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তাঁর পরাজয় ছিল নির্বাচনী পরাজয়; তাঁর আদর্শের পরাজয় নয়।
আজকের দিনে যখন রাজনৈতিক সাফল্যকে প্রায়ই ভোটের সংখ্যা, ক্ষমতার অবস্থান কিংবা সাংগঠনিক শক্তির মাপকাঠিতে বিচার করা হয়, তখন নজরুলের ১৯২৬ সালের নির্বাচনী অভিজ্ঞতা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়—রাজনীতির চূড়ান্ত সাফল্য কি কেবল নির্বাচনে জয়ী হওয়ার মধ্যেই নিহিত?
নজরুলের জীবন তার উত্তর দেয় অন্যভাবে। তিনি ভোটে জয়ী হননি, কিন্তু মানুষের মুক্তির যে স্বপ্ন তিনি ধারণ করেছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনায় গভীরভাবে প্রোথিত হয়েছে। তাঁর কবিতার বিদ্রোহ, তাঁর গানের সাম্য, তাঁর মানবতাবাদ এবং সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান আজও প্রাসঙ্গিক।
তাই ১৯২৬ সালের নির্বাচনে নজরুলের পরাজয়কে ইতিহাসের শেষ কথা বলা যায় না। বরং সেটি ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়—যেখানে একজন কবি ক্ষমতার প্রতিষ্ঠিত কাঠামোর কাছে পরাজিত হয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর চিন্তা ও আদর্শ শেষ পর্যন্ত সময়ের কাছে পরাজিত হয়নি।
নির্বাচনের ব্যালট বাক্সে তাঁর জয় আসেনি; কিন্তু ইতিহাসের দীর্ঘ পরীক্ষায় তাঁর কণ্ঠস্বরই টিকে আছে। সেই অর্থে ১৯২৬-এর নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী কাজী নজরুল ইসলাম আজও আমাদের কাছে এক অনন্য রাজনৈতিক ও মানবিক বিজয়ের প্রতীক।