ঢাকা | ২৭ আগস্ট ২০২৬
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি পদের ইতিহাসও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় গঠিত মুজিবনগর সরকারের রাষ্ট্রপতি থেকে শুরু করে সামরিক অভ্যুত্থান, সামরিক শাসন, গণঅভ্যুত্থান, সংসদীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন—সবকিছুর মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতির পদটি কখনও রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু, আবার কখনও প্রধানত সাংবিধানিক ও আনুষ্ঠানিক পদ হিসেবে ভূমিকা পালন করেছে।
১৯৭১ সালে স্বাধীনতার সূচনা থেকে ২৬ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদে আনুষ্ঠানিক ক্রমিক হিসেবে ২৩ জন রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে এই হিসাবের মধ্যে একই ব্যক্তি একাধিক মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কয়েকজন ভারপ্রাপ্ত বা অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিও ছিলেন।
আর ব্যক্তির সংখ্যা ধরে হিসাব করলে চিত্রটি ভিন্ন। কারণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ একাধিক মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেছেন। আবার সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মুহম্মদুল্লাহ, বিচারপতি আবদুস সাত্তার, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ, ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার, মো. আবদুল হামিদ এবং সাম্প্রতিক সময়ে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বিভিন্ন সময়ে ভারপ্রাপ্ত বা অস্থায়ী দায়িত্ব পালন করেছেন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতিদের দায়িত্বকাল নির্ধারণে একাধিক মেয়াদকে আলাদা করে দেখা হয়েছে।
| ক্রম/পর্যায় | রাষ্ট্রপতি | দায়িত্বকাল | দায়িত্বের সময় |
|---|---|---|---|
| ১ | বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান | ২৬ মার্চ ১৯৭১ – ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ | ২৯২ দিন* |
| ভারপ্রাপ্ত | সৈয়দ নজরুল ইসলাম | ২৬ মার্চ ১৯৭১ – ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ | ২৯০ দিন* |
| ৩ | বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী | ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ – ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৩ | ৭১২ দিন |
| ৪ | মুহম্মদুল্লাহ | ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৩ – ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ | ৩৯৮ দিন |
| ৬ | বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান | ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ – ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ | ২০২ দিন |
| ৭ | খন্দকার মোশতাক আহমদ | ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ – ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ | ৮৩ দিন |
| ৮ | বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম | ৬ নভেম্বর ১৯৭৫ – ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ | ৫৩২ দিন |
| ৯ | জিয়াউর রহমান | ২১ এপ্রিল ১৯৭৭ – ৩০ মে ১৯৮১ | ১,৫০০ দিন |
| ১০ | বিচারপতি আবদুস সাত্তার | ৩০ মে ১৯৮১ – ২৪ মার্চ ১৯৮২ | ২৯৮ দিন |
| ১২ | বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দীন চৌধুরী | ২৭ মার্চ ১৯৮২ – ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৩ | ৬২৪ দিন |
| ১৩ | হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ | ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৩ – ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ | ২,৫৫২ দিন |
| ১৫ | বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ | ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ – ৯ অক্টোবর ১৯৯১ | ৩০৭ দিন** |
| ১৬ | আবদুর রহমান বিশ্বাস | ৯ অক্টোবর ১৯৯১ – ৯ অক্টোবর ১৯৯৬ | ১,৮২৭ দিন |
| ১৭ | বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ | ৯ অক্টোবর ১৯৯৬ – ১৪ নভেম্বর ২০০১ | ১,৮৬২ দিন |
| ১৮ | এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী | ১৪ নভেম্বর ২০০১ – ২১ জুন ২০০২ | ২১৯ দিন |
| ভারপ্রাপ্ত | ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার | ২১ জুন ২০০২ – ৬ সেপ্টেম্বর ২০০২ | ৭৭ দিন |
| ২০ | অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ | ৬ সেপ্টেম্বর ২০০২ – ১২ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ | ২,৩৫১ দিন |
| ২১ | মো. জিল্লুর রহমান | ১২ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ – ২০ মার্চ ২০১৩ | ১,৪৯৭ দিন |
| ২২ | মো. আবদুল হামিদ | ১৪ মার্চ ২০১৩ – ২৪ এপ্রিল ২০২৩ | মোট প্রায় ৩,৬৯৩ দিন*** |
| ২৩ | মো. সাহাবুদ্দিন | ২৪ এপ্রিল ২০২৩ – ২৪ জুলাই ২০২৬ | ১,১৮৭ দিন |
| ভারপ্রাপ্ত | হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম | ২৪ জুলাই ২০২৬ – ২১ আগস্ট ২০২৬ | ২৮ দিন**** |
| ২৩তম | মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর | ২১ আগস্ট ২০২৬ – বর্তমান | ২৬ আগস্ট পর্যন্ত ৫ দিন |
নোট: দিনের হিসাব সাধারণত দায়িত্ব গ্রহণের তারিখ থেকে দায়িত্ব শেষ হওয়ার তারিখ পর্যন্ত ব্যবধান ধরে করা হয়েছে। একই দিনে দায়িত্ব হস্তান্তরের কারণে “অন্তর্ভুক্তিমূলক দিন গণনা” করলে কোথাও কোথাও এক দিনের পার্থক্য হতে পারে।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সরকারি তালিকায় আবু সাঈদ চৌধুরী, জিয়াউর রহমান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং মো. আবদুল হামিদের মতো কয়েকজনের দায়িত্বকাল একাধিক সাংবিধানিক বা আনুষ্ঠানিক পর্যায়ে ভাগ করে দেখানো হয়েছে। এখানে পাঠকের সুবিধার জন্য একই ব্যক্তির ধারাবাহিক সময়কাল একত্র করা হয়েছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের ইতিহাস শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের মধ্যেই।
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে গণ্য করা হয়। কিন্তু তিনি তখন পাকিস্তানে বন্দি ছিলেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম অস্থায়ী বা ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
এ কারণেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ইতিহাসে একটি বিশেষ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল—একই সময়ে একজন ছিলেন রাষ্ট্রপতি এবং তাঁর অনুপস্থিতিতে আরেকজন পালন করছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সরকারি তালিকায় বঙ্গবন্ধুর প্রথম দায়িত্বকাল ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে ১২ জানুয়ারি ১৯৭২ এবং সৈয়দ নজরুল ইসলামের অস্থায়ী দায়িত্বকাল ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে ১০ জানুয়ারি ১৯৭২ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী অধ্যায়গুলোর একটি।
১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার সময় তিনি রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন।
তাঁর দায়িত্বকাল ছিল প্রায় এক বছর ১১ মাস ১২ দিন বা ৭১২ দিন।
এরপর রাষ্ট্রপতি হন মুহম্মদুল্লাহ। তিনি প্রথমে রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে এবং পরে পূর্ণ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দুই পর্যায় মিলিয়ে তাঁর দায়িত্বকাল ছিল প্রায় ৩৯৮ দিন। সরকারি তালিকায় তাঁর দায়িত্বের দুটি ধাপ আলাদাভাবে উল্লেখ রয়েছে।
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আবার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
এই সময় বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসে এবং রাষ্ট্রপতির হাতে নির্বাহী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়। কিন্তু তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদ স্থায়ী হয় মাত্র ২০২ দিন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তিনি সপরিবারে নিহত হন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি দুটি পৃথক ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন—একবার মুক্তিযুদ্ধকালীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে এবং দ্বিতীয়বার স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে।
১৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হন।
তাঁর দায়িত্বকাল ছিল মাত্র ৮৩ দিন।
১৯৭৫ সালের নভেম্বরের পালাবদলের পর তিনি ক্ষমতা হারান এবং বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭৫ সালের কয়েক মাস রাষ্ট্রপতি পদে সবচেয়ে দ্রুত পরিবর্তনের সময়গুলোর একটি।
বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম দায়িত্ব পালন করেন প্রায় ৫৩২ দিন।
এরপর ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিয়াউর রহমানের সময়কাল ছিল প্রায় ১,৫০০ দিন বা চার বছরের বেশি। ১৯৭৮ সালে নির্বাচনের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রপতির পদে আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক বৈধতা পান।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক বিদ্রোহের মধ্যে তিনি নিহত হন।
জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর বিচারপতি আবদুস সাত্তার প্রথমে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন।
পরে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয়ী হয়ে পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
সব মিলিয়ে তাঁর দায়িত্বকাল ছিল প্রায় ২৯৮ দিন।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাঁর সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়।
বিচারপতি এ এফ এম আহসানউদ্দীন চৌধুরী ১৯৮২ সালের মার্চে রাষ্ট্রপতি হন এবং দায়িত্ব পালন করেন প্রায় ৬২৪ দিন।
এরপর ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।
তাঁর দায়িত্বকাল ছিল প্রায় ২,৫৫২ দিন বা প্রায় সাত বছর।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের মধ্যে দীর্ঘ দায়িত্বকাল বিবেচনায় তিনি অন্যতম দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রপ্রধান।
১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর এরশাদ পদত্যাগ করেন।
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন।
এই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা ছিল সামরিক শাসনের অবসান এবং বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়া।
তিনি প্রায় ৩০৭ দিন দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে তিনি আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং দ্বিতীয় মেয়াদে প্রায় ১,৮৬২ দিন দায়িত্ব পালন করেন।
অর্থাৎ বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ বাংলাদেশের ইতিহাসে দুই ভিন্ন পর্যায়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনকারী অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব।
১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি হন আবদুর রহমান বিশ্বাস।
তিনি ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন—অর্থাৎ প্রায় পূর্ণ পাঁচ বছর বা ১,৮২৭ দিন।
বাংলাদেশের সংসদীয় শাসনব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির ভূমিকা তখন মূলত সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধানের।
বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর এবং কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি রাষ্ট্রপতি থাকতে পারেন না।
২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী রাষ্ট্রপতি হন।
কিন্তু তাঁর মেয়াদ ছিল মাত্র ২১৯ দিন।
২০০২ সালের ২১ জুন তাঁর পদত্যাগের পর তৎকালীন স্পিকার ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্বপ্রাপ্ত হন।
তিনি ৭৭ দিন দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর ৬ সেপ্টেম্বর ২০০২ সালে রাষ্ট্রপতি হন অধ্যাপক ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ।
ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ দায়িত্ব পালন করেন ২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
তাঁর দায়িত্বকাল ছিল প্রায় ২,৩৫১ দিন, অর্থাৎ ছয় বছরেরও বেশি।
এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জরুরি অবস্থা ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতি হন মো. জিল্লুর রহমান।
তিনি ২০১৩ সালের ২০ মার্চ দায়িত্ব পালনকালে মারা যান।
তাঁর দায়িত্বকাল ছিল প্রায় ১,৪৯৭ দিন।
রাষ্ট্রপতির মৃত্যুজনিত কারণে সাংবিধানিকভাবে দায়িত্বের শূন্যতা তৈরি হলে স্পিকার মো. আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
মো. আবদুল হামিদ প্রথমে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
তিনি পরপর দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতি ছিলেন এবং ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল দায়িত্ব শেষ করেন।
সরকারি তালিকা অনুযায়ী তাঁর দায়িত্বের মধ্যে ভারপ্রাপ্ত, অস্থায়ী এবং পূর্ণ রাষ্ট্রপতির একাধিক ধাপ রয়েছে। সব মিলিয়ে তিনি প্রায় দশ বছর এক মাসের বেশি সময় রাষ্ট্রপতি বা রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে ছিলেন।
পূর্ণ রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর দুই মেয়াদ ছিল টানা ১০ বছর—২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল থেকে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল পর্যন্ত। সরকারি তালিকা অনুযায়ী এই দুই পূর্ণ মেয়াদই ছিল পাঁচ বছর করে।
দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের হিসেবে মো. আবদুল হামিদ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের মধ্যে শীর্ষে।
২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হন মো. সাহাবুদ্দিন।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সরকারি তালিকায় তাঁর দায়িত্বকাল ২৪ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত দেখানো হয়েছে। অর্থাৎ তিনি প্রায় ১,১৮৭ দিন দায়িত্ব পালন করেন।
এরপর হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
২১ আগস্ট ২০২৬ নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত ও শপথ গ্রহণের আগ পর্যন্ত তাঁর ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বকাল ছিল প্রায় ২৮ দিন।
২০২৬ সালের ২১ আগস্ট মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
বাংলাদেশ সরকার প্রকাশিত গেজেটে বলা হয়েছে, তিনি ২১ আগস্ট রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ গ্রহণ ও রাষ্ট্রপতির কার্যভার গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের ওয়েবসাইটেও তাঁকে বর্তমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
২৬ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত তিনি দায়িত্বে রয়েছেন এবং এই প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত তাঁর দায়িত্বকাল পাঁচ দিন।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের দায়িত্বকাল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
পূর্ণ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দুই মেয়াদে প্রায় ১০ বছর। ভারপ্রাপ্ত সময়সহ দায়িত্বকাল আরও কিছুটা বেশি।
প্রায় ২,৫৫২ দিন, অর্থাৎ প্রায় সাত বছর।
প্রায় ২,৩৫১ দিন, অর্থাৎ ছয় বছরের বেশি।
দুই মেয়াদ মিলিয়ে প্রায় ২,১৬৯ দিন—এর মধ্যে প্রথমটি ছিল অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে।
প্রায় ১,৮২৭ দিন, অর্থাৎ পূর্ণ পাঁচ বছরের মেয়াদ।
রাষ্ট্রপতি পদের ইতিহাসে সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত দায়িত্বকালগুলোর মধ্যে রয়েছে—
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের ইতিহাসকে মোটামুটি কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়।
১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সালের শুরু পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদ ছিল নতুন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতির হাতে নির্বাহী ক্ষমতা অনেক বেশি কেন্দ্রীভূত হয়।
জিয়াউর রহমান ও হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময় রাষ্ট্রপতি পদ ছিল কার্যকর রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র।
১৯৯১ সালের পর রাষ্ট্রপতি পদ মূলত সাংবিধানিক রাষ্ট্রপ্রধানের পদে রূপ নেয়।
বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামোয় রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পাঁচ বছর। সংবিধান অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি দুই মেয়াদের বেশি রাষ্ট্রপতি থাকতে পারেন না। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক নীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে অবহিত রাখবেন।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক দায়িত্বের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় ও আনুষ্ঠানিক দায়িত্বও পালন করেন।
এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে কীভাবে গণনা করা হচ্ছে, তার ওপর।
বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর হলেন বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি।
একই ব্যক্তি একাধিকবার দায়িত্ব পালন করেছেন। যেমন—
এ ছাড়া ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতিদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে কি না, সেটিও গণনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
সুতরাং সবচেয়ে নির্ভুলভাবে বলা যায়: বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের সরকারি ধারাবাহিক ক্রম বর্তমানে ২৩ পর্যন্ত পৌঁছেছে, তবে একই ব্যক্তি একাধিকবার দায়িত্ব পালন করায় ব্যক্তি-সংখ্যা ও রাষ্ট্রপতির ক্রমিক সংখ্যা এক নয়।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের তালিকা কেবল কয়েকটি নাম ও তারিখের তালিকা নয়।
এই তালিকার মধ্যে রয়েছে—
অর্থাৎ, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের ইতিহাস পড়লে মূলত বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনীতির গত ৫৫ বছরের ইতিহাসও সামনে এসে দাঁড়ায়।
১৯৭১ → বঙ্গবন্ধু ও ভারপ্রাপ্ত সৈয়দ নজরুল ইসলাম
⬇
১৯৭২ → আবু সাঈদ চৌধুরী
⬇
১৯৭৩-৭৫ → মুহম্মদুল্লাহ
⬇
১৯৭৫ → বঙ্গবন্ধু, মোশতাক, সায়েম
⬇
১৯৭৭-৮১ → জিয়াউর রহমান
⬇
১৯৮১-৮২ → আবদুস সাত্তার
⬇
১৯৮২-৮৩ → আহসানউদ্দীন চৌধুরী
⬇
১৯৮৩-৯০ → হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ
⬇
১৯৯০-৯১ → অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ
⬇
১৯৯১-৯৬ → আবদুর রহমান বিশ্বাস
⬇
১৯৯৬-২০০১ → রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ
⬇
২০০১-০২ → বদরুদ্দোজা চৌধুরী
⬇
২০০২ → দায়িত্বপ্রাপ্ত জমির উদ্দিন সরকার
⬇
২০০২-০৯ → ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ
⬇
২০০৯-১৩ → জিল্লুর রহমান
⬇
২০১৩-২৩ → মো. আবদুল হামিদ
⬇
২০২৩-২৬ → মো. সাহাবুদ্দিন
⬇
জুলাই-আগস্ট ২০২৬ → ভারপ্রাপ্ত হাফিজ উদ্দিন আহমদ
⬇
২১ আগস্ট ২০২৬ থেকে বর্তমান → মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
এই প্রতিবেদনে দায়িত্বকালের তারিখের প্রধান ভিত্তি হিসেবে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রকাশিত সরকারি তালিকা ব্যবহার করা হয়েছে। বর্তমান রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দায়িত্ব গ্রহণের তথ্য সরকারি গেজেট এবং রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সাম্প্রতিক হালনাগাদ থেকে নেওয়া হয়েছে।
