মোঃ আব্দুল আউয়াল।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
ভদ্রতা কি দুর্বলতার নতুন নাম—এই প্রশ্নটি আজ আর কেবল কোনো নৈতিক আলোচনার অংশ নয়, এটি ক্রমেই সামাজিক বাস্তবতার এক তীক্ষ্ণ নির্ণায়ক হয়ে উঠছে। এক সময় ভদ্রতা ছিল মানুষের গৌরব, চরিত্রের অলংকার, সামাজিক সম্পর্কের ভিত্তি। এখন সেই ভদ্রতাই অনেকের চোখে অপ্রয়োজনীয়, কখনো বিরক্তিকর, কখনো আবার সরাসরি অযোগ্যতার প্রমাণ। যে চুপ থাকে, তাকে দুর্বল বলা হয়; যে ধৈর্য ধরে, তাকে সুযোগহীন মনে করা হয়; যে নম্রভাবে কথা বলে, তার আত্মবিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ভদ্রতার অর্থ, প্রয়োজন ও অবস্থান নতুন করে ভাবা ছাড়া উপায় নেই।
সমাজ সবসময়ই শক্তির ভাষা বোঝে—এ কথা আংশিক সত্য। কিন্তু শক্তির সংজ্ঞা সময়ের সঙ্গে বদলায়। এক সময় শক্তি ছিল শারীরিক, পরে হলো অর্থনৈতিক, এরপর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক। বর্তমান সময়ে শক্তি মানে দৃশ্যমান দাপট, উচ্চস্বরে কথা বলা, তর্কে জেতা, অন্যকে কোণঠাসা করা, নিজের উপস্থিতি জোর করে জানান দেওয়া। এই শক্তির ভাষার ভিড়ে ভদ্রতা যেন নিঃশব্দ, অপ্রাসঙ্গিক এক অনুষঙ্গ। ভদ্র মানুষ কথা কম বলে, শোনে বেশি; নিজের অধিকারের কথা তুললেও তা হয় সংযত কণ্ঠে; অন্যের সীমা লঙ্ঘন না করাকে সে নিজের সীমা মনে করে না। কিন্তু এই সংযম, এই সীমাবোধই আজ তাকে সমাজের চোখে দুর্বল করে তুলছে।
আসলে ভদ্রতা কখনোই কেবল আচরণের বিষয় ছিল না; এটি ছিল এক ধরনের মানসিক শৃঙ্খলা। ভদ্র মানুষ জানে কখন কথা বলতে হয়, কখন নীরব থাকতে হয়; কখন প্রতিবাদ জরুরি, আর কখন অপেক্ষা বুদ্ধিমানের। এই জ্ঞান আসে আত্মনিয়ন্ত্রণ থেকে। অথচ আত্মনিয়ন্ত্রণ এমন এক গুণ, যা আধুনিক সমাজে দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে। আমরা চাই তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, তাৎক্ষণিক ফল, তাত্ক্ষণিক জয়। এই তাড়াহুড়োর ভেতরে ভদ্রতা সময় নেয়, আর সময় নেওয়ার এই প্রবণতাই তাকে অচল বলে চিহ্নিত করছে।
শিশুদের বড় হতে দেখা যায় আজ এক ভিন্ন পাঠ নিয়ে। আগে শেখানো হতো—ভদ্র হও, বড়দের সম্মান করো, ধৈর্য ধরো। এখন শেখানো হয়—স্মার্ট হও, সুযোগ নাও, নিজের কথা জোর দিয়ে বলো। এই শিক্ষার ভেতর ভদ্রতা নেই এমন নয়, কিন্তু তা আর কেন্দ্রীয় নয়। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে ভদ্রতা হয়ে উঠছে ঐচ্ছিক, পরিস্থিতিনির্ভর, কখনো প্রয়োজনীয় আবার কখনো ক্ষতিকর। কেউ যদি অতিরিক্ত ভদ্র হয়, তাকে বলা হয় বাস্তবজ্ঞানহীন, তাকে বলা হয় ‘লাইফে টিকে থাকতে পারবে না’। এই বাক্যটি যেন আধুনিক সমাজের এক নিষ্ঠুর সার্টিফিকেট।
কর্মক্ষেত্রে ভদ্রতার অবস্থা আরও করুণ। অফিসে যে শান্তভাবে কাজ করে, নির্দেশ মানে, কথা কম বলে—সে প্রায়ই উপেক্ষিত হয়। যে চিৎকার করে দাবি তোলে, যে নিজের সাফল্য নিজেই ঘোষণা করে, যে অন্যের কাজের কৃতিত্ব নিতে দ্বিধা করে না—সে দ্রুত চোখে পড়ে। এখানে ভদ্রতা হয়ে ওঠে পিছিয়ে পড়ার এক অদৃশ্য কারণ। ধীরে ধীরে মানুষ শিখে যায়, ভদ্র থাকলে ঠকে যেতে হয়। এই শেখা পাঠ সমাজে ছড়িয়ে পড়ে, এবং এক সময় ভদ্রতা নিজেই সন্দেহের বস্তু হয়ে দাঁড়ায়।
রাজনীতি তো বরাবরই ভদ্রতার প্রতিকূল ক্ষেত্র। এখানে নম্রতা মানে পরাজয়ের আশঙ্কা, শালীনতা মানে দুর্বল কৌশল। উচ্চস্বরে কথা বলা, প্রতিপক্ষকে অপমান করা, শক্ত ভাষায় আক্রমণ করা—এসবই জনপ্রিয়তা এনে দেয়। ভদ্র রাজনীতিবিদকে বলা হয় ‘অকার্যকর’, ‘মোলায়েম’, ‘নিরীহ’। ফলে রাজনীতির ময়দান থেকে ভদ্রতা ক্রমে নির্বাসিত হয়। অথচ রাজনীতিই এমন একটি ক্ষেত্র, যেখানে ভদ্রতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন—কারণ এখানেই সিদ্ধান্ত হয় কোটি মানুষের ভাগ্য। ভদ্রতার অভাব এখানে কেবল ব্যক্তিগত নয়, রাষ্ট্রীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ভদ্রতাকে দুর্বলতা মনে করার এই প্রবণতার পেছনে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক সংকট কাজ করে। আমরা আসলে ক্ষমতার সঙ্গে নৈতিকতাকে গুলিয়ে ফেলেছি। শক্ত হতে হলে নিষ্ঠুর হতে হবে—এই ধারণা এতটাই প্রোথিত যে, ভদ্র মানুষকে আমরা শক্ত ভাবতেই পারি না। অথচ ইতিহাস বলে ভিন্ন কথা। পৃথিবীর বহু বড় পরিবর্তন এসেছে নীরব, ভদ্র, দৃঢ় মানুষদের হাত ধরে। তারা চিৎকার করেনি, কিন্তু পিছু হটেনি। তারা গালাগালি করেনি, কিন্তু আপসও করেনি। ভদ্রতা তাদের দুর্বল করেনি; বরং তাদের শক্তিকে নিয়ন্ত্রিত করেছে।
ভদ্রতা মানে আপস নয়, এটি একটি সচেতন অবস্থান। ভদ্র মানুষ অন্যায় দেখেও চুপ থাকবে—এমন নয়। বরং সে জানে কখন প্রতিবাদ করলে তা কার্যকর হবে। সে জানে, প্রতিটি লড়াই চিৎকার করে জেতা যায় না। এই উপলব্ধি আজকের সমাজে বিরল। আমরা চাই দৃশ্যমান প্রতিবাদ, তাৎক্ষণিক উত্তেজনা। শান্ত প্রতিবাদ আমাদের চোখে পড়ে না, তাই আমরা তাকে গুরুত্ব দিই না। কিন্তু গুরুত্ব না দিলেই যে তার শক্তি কমে যায়, তা নয়।
সমস্যা তখনই হয়, যখন ভদ্রতা ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। অনেক সময় মানুষ নিজের ভয়, নিজের অনিশ্চয়তা ঢাকতে ভদ্রতার মুখোশ পরে। সে কথা বলে না, কারণ সে ভয় পায়; সে প্রতিবাদ করে না, কারণ সে সংঘাত এড়াতে চায়। এই ধরনের নীরবতা ভদ্রতা নয়, এটি আত্মসমর্পণ। সমাজ এই পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়, ফলে ভদ্রতার ধারণাটাই কলুষিত হয়ে যায়। সত্যিকারের ভদ্রতা আসে আত্মবিশ্বাস থেকে, ভয়ের থেকে নয়।
আজকের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভদ্রতার জায়গা আরও সংকুচিত। এখানে দ্রুত প্রতিক্রিয়া, তীক্ষ্ণ মন্তব্য, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ—এসবই বাহবা পায়। সংযত ভাষা, চিন্তাশীল মন্তব্য খুব কমই নজর কাড়ে। ফলে মানুষ শিখে যায়, ভদ্র হলে দৃশ্যমান হওয়া যায় না। দৃশ্যমান না হলে অস্তিত্বই যেন প্রশ্নের মুখে পড়ে। এই মানসিকতা ভদ্রতাকে আরও একধাপ পেছনে ঠেলে দেয়।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়—ভদ্রতা কি সত্যিই দুর্বলতার নতুন নাম হয়ে গেছে, নাকি আমরা দুর্বলতাকেই ভদ্রতা ভেবে ভুল করছি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের নিজেদের আয়নায় তাকাতে হবে। আমরা কি ভদ্র মানুষকে সম্মান করি? আমরা কি শান্ত কণ্ঠের কথা শুনতে প্রস্তুত? আমরা কি শক্তির পাশাপাশি সংযমকেও মূল্য দিই? যদি না দিই, তবে ভদ্রতা দুর্বল হয়ে পড়বে—কারণ সমাজ যে গুণকে পুরস্কৃত করে না, সে গুণ টিকে থাকতে পারে না।
ভদ্রতার মৃত্যু মানে কেবল সৌজন্যের অবসান নয়; এটি মানে সহাবস্থানের সংকট। ভদ্রতা ছাড়া সমাজ টিকে থাকতে পারে না, কারণ ভদ্রতাই মানুষকে মানুষ হিসেবে চিনতে শেখায়। শক্তির ভাষা এক সময় সবকিছু দখল করতে পারে, কিন্তু তা সম্পর্ক গড়ে না, বরং ভাঙে। ভদ্রতা সম্পর্ক গড়ে, আস্থা তৈরি করে, দীর্ঘস্থায়ী সমাধানের পথ দেখায়। এই সত্য যতদিন আমরা ভুলে থাকব, ততদিন ভদ্রতা দুর্বলতার তকমা বহন করবে।
অতএব ভদ্রতা দুর্বলতার নতুন নাম কি না—এই প্রশ্নের উত্তর একরৈখিক নয়। ভদ্রতা দুর্বলতা নয়, কিন্তু দুর্বল সমাজ ভদ্রতাকে দুর্বলতা বানিয়ে তোলে। ভদ্রতা তখনই শক্তি হয়ে ওঠে, যখন তার পেছনে থাকে দৃঢ়তা, ন্যায়ের প্রতি অবিচলতা, এবং প্রয়োজন হলে দৃশ্যমান হওয়ার সাহস। ভদ্রতা মানে মাথা নত করা নয়, বরং মাথা উঁচু রেখে কথা বলা—শান্তভাবে, কিন্তু অটলভাবে। এই ভদ্রতাই আমাদের নতুন করে শেখা দরকার, যদি আমরা চাই শক্তি আর মানবিকতার মধ্যে কোনো বিরোধ না থাকুক।