মোঃ আব্দুল আউয়াল।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
একসময় নৈতিক সাহস বলতে বোঝাত—সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর দৃঢ়তা, ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করার ক্ষমতা, একা হলেও বিবেকের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা না করার অটল মানসিকতা। সেই সাহস জন্ম নিত ভেতরের এক অদৃশ্য অথচ প্রবল শক্তি থেকে, যা বাহবা বা পুরস্কারের অপেক্ষা করত না। আজকের পৃথিবীতে, বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে, সেই নৈতিক সাহস ক্রমেই যেন দুর্লভ হয়ে উঠছে। মানুষ কথা বলে আগের চেয়ে অনেক বেশি, কিন্তু সত্য বলে আগের চেয়ে অনেক কম। শব্দ বেড়েছে, অথচ সাহস কমেছে। এই বৈপরীত্য কেবল ব্যক্তিগত চরিত্রের সংকট নয়; এটি একটি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনস্তাত্ত্বিক সঙ্কট—যার শিকড় ছড়িয়ে আছে ডিজিটাল পরিসরের গভীরে।
সোশ্যাল মিডিয়া প্রথমে এসেছিল মতপ্রকাশের মুক্ত মঞ্চ হিসেবে। বলা হয়েছিল, এখানে সবাই সমান, এখানে কারও কণ্ঠ চাপা দেওয়া যায় না। বাস্তবে যা ঘটল, তা হলো—এই মঞ্চে কণ্ঠ আছে ঠিকই, কিন্তু সাহস নেই। এখানে কথা বলা হয়, কিন্তু অবস্থান নেওয়া হয় না। কারণ অবস্থান নেওয়া মানেই ঝুঁকি। আর ঝুঁকি নেওয়ার সংস্কৃতি এই যুগের সবচেয়ে বড় অনুপস্থিতি। মানুষ এখন নিরাপদ মতামত খোঁজে, নিরাপদ নীরবতা বেছে নেয়, নিরাপদ পক্ষ অবলম্বন করে। নৈতিক সাহসের প্রথম শর্ত—নিজের অবস্থানের ঝুঁকি মেনে নেওয়া—এই শর্তেই আমরা অধিকাংশ সময় ব্যর্থ হই।
সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের শিখিয়েছে প্রতিক্রিয়া দিতে, চিন্তা করতে নয়। একটি ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে মত দিতে হবে, স্ট্যাটাস দিতে হবে, রিল বানাতে হবে। এই তাড়াহুড়োর মধ্যে বিবেকের সংলাপ হারিয়ে যায়। নৈতিক সাহস কখনো তাড়াহুড়ো করে জন্মায় না; এটি জন্মায় গভীর চিন্তা, আত্মসমালোচনা ও মূল্যবোধের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম ধৈর্যের শত্রু। এখানে সময় মানে টাকা, মনোযোগ মানে পুঁজি। ফলে চিন্তাশীল নীরবতা অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে, আর আবেগপ্রবণ চিৎকার লাভজনক হয়ে দাঁড়ায়। নৈতিক সাহসের জন্য যে নীরব প্রস্তুতির দরকার, এই প্ল্যাটফর্ম তা ধ্বংস করে দেয়।
এই যুগে মানুষ সত্যের চেয়ে জনপ্রিয়তাকে বেশি ভয় পায় না, বরং বেশি ভালোবাসে। ‘লাইক’, ‘শেয়ার’, ‘ফলোয়ার’—এই তিনটি সংখ্যাই আজকের সামাজিক মর্যাদার নতুন মাপকাঠি। নৈতিক সাহস যেখানে প্রায়ই অজনপ্রিয় অবস্থান দাবি করে, সেখানে জনপ্রিয়তার এই দাসত্ব মানুষকে আপসকামী করে তোলে। সত্য বললে যদি ফলোয়ার কমে যায়, যদি বন্ধুরা আনফলো করে, যদি পরিচিত মহলে ‘বিতর্কিত’ তকমা জোটে—এই ভয় মানুষকে নীরব থাকতে শেখায়। ধীরে ধীরে নীরবতা অভ্যাসে পরিণত হয়, আর অভ্যাস একসময় চরিত্র হয়ে ওঠে।
নৈতিক সাহসের আরেকটি বড় শত্রু হলো ডিজিটাল জনতার মানসিকতা। সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যক্তি নয়, ভিড় কথা বলে। এই ভিড় কখনো যুক্তি বোঝে না, সূক্ষ্মতা মানে না, প্রেক্ষাপটকে গুরুত্ব দেয় না। ভিড় চায় সহজ শত্রু, সরল গল্প, তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ। এই ভিড়ের সামনে দাঁড়িয়ে ভিন্ন কথা বলা মানেই নিজেকে আক্রমণের মুখে ঠেলে দেওয়া। ট্রল, হুমকি, চরিত্রহনন—এসব এখন নৈতিক সাহসের মূল্য। ফলে অনেকেই আগেভাগেই হিসাব কষে নেন: এই সত্য বলার মতো সাহস কি আমার আছে? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উত্তর হয়—না।
এখানে প্রশ্ন আসে—নৈতিক সাহস কি কেবল ব্যক্তিগত গুণ? নাকি সমাজ ও কাঠামোও এর জন্য দায়ী? সত্য হলো, নৈতিক সাহস একা একা টিকে থাকতে পারে না। এটি লালিত হয় পরিবারে, শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে, রাষ্ট্রের আচরণে। যখন শিশুকে শেখানো হয়—“ঝামেলায় জড়িও না”, “নিজেরটা দেখো”, “বড়দের সঙ্গে তর্ক কোরো না”—তখন আমরা আসলে নৈতিক সাহসের বীজ উপড়ে ফেলি। সোশ্যাল মিডিয়া এই শিক্ষারই আধুনিক সম্প্রসারণ। এখানে সবাই বলে—“নিজের ক্ষতি কেন করবে?”, “এই কথা বলে লাভ কী?”। লাভ-ক্ষতির এই হিসাব নৈতিক সাহসের সবচেয়ে বড় শত্রু।
শিক্ষাব্যবস্থাও এই সংকটে কম দায়ী নয়। আমরা এমন এক শিক্ষা পাই, যা উত্তর মুখস্থ করাতে শেখায়, প্রশ্ন করতে নয়। পরীক্ষায় নম্বর পেতে হলে নিরাপদ উত্তর দিতে হয়, বিতর্কিত প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে হয়। এই মানসিকতা নিয়ে মানুষ যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় আসে, তখনও সে নিরাপদ মত খোঁজে। নৈতিক সাহস যেখানে প্রশ্ন তোলে ক্ষমতার কাঠামোকে, সেখানে এই শিক্ষা মানুষকে শেখায়—ক্ষমতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে। ফলে ডিজিটাল পরিসরে আমরা পাই অসংখ্য শিক্ষিত মানুষ, কিন্তু খুব কম সাহসী নাগরিক।
সোশ্যাল মিডিয়ার আরেকটি গভীর প্রভাব পড়েছে আত্মপরিচয়ের ওপর। মানুষ এখন নিজেকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে দেখতে শিখেছে। কী লিখলে ইমেজ নষ্ট হবে, কী বললে গ্রহণযোগ্যতা কমবে—এই চিন্তা সর্বক্ষণ মাথায় ঘোরে। নৈতিক সাহস ব্র্যান্ডিংয়ের পরিপন্থী, কারণ এটি প্রায়ই অসম্পূর্ণ, অগোছালো, দ্বিধাগ্রস্ত সত্যকে সামনে আনে। ব্র্যান্ড হিসেবে নিজেকে ঝকঝকে রাখতে চাইলে এমন সত্য বলা যায় না। তাই মানুষ নিরাপদ বাক্য ব্যবহার করে, জনপ্রিয় শব্দ ধার করে, চলতি ন্যারেটিভের সঙ্গে গা ভাসিয়ে দেয়।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—ভয়ের রাজনৈতিক অর্থনীতি। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভয় ছড়ানো খুব সহজ, এবং তা প্রায়ই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে উৎসাহিত। নজরদারি, ডিজিটাল আইন, মামলার ভয়, চাকরি হারানোর আশঙ্কা—এসব বাস্তবতা মানুষকে আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য করে। নৈতিক সাহস তখন আর কেবল নৈতিক প্রশ্ন থাকে না; এটি হয়ে ওঠে টিকে থাকার প্রশ্ন। যখন সত্য বলার মূল্য হয় অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, তখন অনেকেই নীরবতাকে বুদ্ধিমত্তা ভেবে নেয়।
তবু প্রশ্ন থেকে যায়—এই নীরবতা কি সত্যিই বুদ্ধিমত্তা, নাকি দীর্ঘমেয়াদে আত্মসমর্পণ? ইতিহাস বলে, নৈতিক সাহসের অভাব সমাজকে ধীরে ধীরে ভেতর থেকে ক্ষয় করে। অন্যায় যখন প্রশ্নহীন হয়ে ওঠে, তখন তা নিয়মে পরিণত হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় নীরবতা কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নয়; এটি অন্যায়কে সামাজিক স্বীকৃতি দেওয়ার এক নীরব প্রক্রিয়া। আমরা যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলি না, তখন আমরা অজান্তেই তার অংশীদার হয়ে উঠি।
এই যুগে নৈতিক সাহস দুষ্প্রাপ্য, কারণ আমরা সাহসকে ভুলভাবে সংজ্ঞায়িত করছি। আমরা ভাবছি, সাহস মানে ভাইরাল হওয়া, জোরে কথা বলা, প্রতিপক্ষকে অপমান করা। অথচ নৈতিক সাহস মানে কখনো কখনো ধীরে কথা বলা, যুক্তি দিয়ে বলা, একা দাঁড়ানো। সোশ্যাল মিডিয়ার চিৎকারের ভিড়ে এই ধীর, যুক্তিপূর্ণ কণ্ঠ হারিয়ে যায়। ফলে সাহসের আসল চেহারা আমাদের চোখের আড়ালে চলে যায়।
তাহলে উপায় কী? নৈতিক সাহস কি এই যুগে সম্ভব? সম্ভব, তবে তা সহজ নয়। এর জন্য দরকার সচেতন অনুশীলন। প্রথমত, আমাদের জনপ্রিয়তার ধারণা ভাঙতে হবে। সত্য সবসময় জনপ্রিয় হবে—এই প্রত্যাশা ছেড়ে দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, আমাদের ডিজিটাল ভিড়ের বাইরে চিন্তা করতে শিখতে হবে। লাইক-শেয়ারের বাইরে নিজের বিবেককে মানদণ্ড বানাতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষায় ও পরিবারে প্রশ্ন করার সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনতে হবে। শিশুকে শেখাতে হবে—ভদ্রতা মানে নীরবতা নয়, আর প্রশ্ন মানেই অবাধ্যতা নয়।
নৈতিক সাহস কোনো অলৌকিক গুণ নয়; এটি চর্চার ফল। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই চর্চা কঠিন, কারণ চারপাশের কাঠামো আমাদের ভীতু হতে শেখায়। তবু ইতিহাসের প্রতিটি সংকটকালে কিছু মানুষ ছিল, যারা ভয়ের চেয়ে সত্যকে বড় করে দেখেছে। তারা সংখ্যায় কম ছিল, কিন্তু প্রভাব ছিল গভীর। আজও সেই সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি। প্রশ্ন শুধু একটাই—আমরা কি সেই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত?
শেষ পর্যন্ত নৈতিক সাহসের সংকট আসলে আমাদের আত্মপরিচয়ের সংকট। আমরা কি কেবল দর্শক, নাকি নাগরিক? কেবল ব্যবহারকারী, নাকি দায়িত্বশীল মানুষ? সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের কণ্ঠ দিয়েছে, কিন্তু সেই কণ্ঠে সত্য ঢালার দায়িত্ব আমাদেরই। যদি আমরা সেই দায়িত্ব এড়িয়ে যাই, তবে শব্দের এই প্রাচুর্যও একদিন আমাদের নীরব ব্যর্থতার সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।