ডেস্ক প্রতিবেদন ।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর মধ্যে জামায়াতে ইসলামী সবচেয়ে সুসংগঠিত হলেও, দলটির আদর্শ ও রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে দেশের কওমি মাদ্রাসাভিত্তিক আলেম এবং জনপ্রিয় ইসলামী বক্তাদের মধ্যে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য রয়েছে। আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই বিরোধ আবারও প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন সভা-সেমিনার, ওয়াজ মাহফিল এবং সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে অনেক প্রভাবশালী ইসলামী ব্যক্তিত্ব জামায়াতের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে বক্তব্য দিচ্ছেন।
জামায়াতের বিপক্ষে ইসলামী চিন্তাবিদদের অবস্থানের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করে:- কওমি ধারার আলেমদের প্রধান অভিযোগ হলো জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আবুল আলা মওদুদীর কিছু ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা। অনেক আলেম মনে করেন, তাঁর লেখা বইগুলোতে নবী-রাসূল ও সাহাবায়ে কেরামদের নিয়ে এমন কিছু মন্তব্য রয়েছে যা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদার সাথে সাংঘর্ষিক।জামায়াত একদিকে ইসলামী খেলাফতের কথা বলে, আবার অন্যদিকে প্রচলিত গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচনে অংশ নেয়। অনেক বক্তা একে ‘দ্বিমুখী নীতি’ হিসেবে সমালোচনা করেন। তাঁদের মতে, ক্ষমতার জন্য জামায়াত অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় আদর্শের চেয়ে রাজনৈতিক কৌশলকে বেশি প্রাধান্য দেয়। দেশের বড় একটি অংশের আলেমদের মতে, কোনো ইসলামী দলের নেতৃত্ব থাকা উচিত হক্কানি আলেমদের হাতে। জামায়াতের নেতৃত্বে সাধারণত আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের প্রাধান্য বেশি থাকায় ঐতিহ্যবাহী আলেম সমাজ একে সহজে গ্রহণ করতে পারে না।
সম্প্রতি ফেসবুক, ইউটিউব এবং ওয়াজ মাহফিলগুলোতে একাধিক ধারার ইসলামী বক্তাদের জামায়াতবিরোধী বক্তব্য লক্ষ্য করা গেছে-
বর্তমানে বাংলাদেশে ইসলামী দলগুলোর মধ্যে বিভক্তি স্পষ্ট। একদিকে জামায়াতে ইসলামী এককভাবে বা নির্দিষ্ট বলয়ে রাজনীতি করছে, অন্যদিকে ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত ১১ দলীয় জোটসহ অন্যান্য ইসলামী মোর্চাগুলো বিকল্প শক্তি হিসেবে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। অনেক আলেম মনে করেন, জামায়াতের বাইরে একটি ‘বিশুদ্ধ ইসলামী রাজনৈতিক ধারা’ তৈরি করা প্রয়োজন, যা সরাসরি আলেমদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হবে।
এই বিরোধিতার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের দাবি, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা ভুল বুঝাবুঝির কারণে আলেমদের একটি অংশ তাঁদের বিপক্ষে কথা বলছেন। তাঁরা মনে করেন, ইসলামের শত্রুদের মোকাবিলা করতে সকল ইসলামী শক্তির ঐক্যবদ্ধ থাকা প্রয়োজন এবং বিভেদ কেবল ইসলামবিদ্বেষীদেরই সুবিধা দেবে।
বাংলাদেশের ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে জামায়াতবিরোধী এই অবস্থান কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং এটি গভীরতর একটি আকিদাগত ও আদর্শিক লড়াই। নির্বাচনের সময় এই বিরোধ আরও তুঙ্গে ওঠে, কারণ প্রতিটি পক্ষই ধর্মপ্রাণ ভোটারদের সমর্থন নিজের দিকে টানতে চায়। তবে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে এই বিভক্তি অনেক সময় বিভ্রান্তি তৈরি করে।
বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের বিরোধিতা করেন এমন বেশ কিছু প্রভাবশালী ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেম রয়েছেন। তাঁদের বিরোধিতার প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হলো জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ আবুল আলা মওদুদীর কিছু ধর্মীয় ব্যাখ্যা এবং দলটির রাজনৈতিক কৌশল।
নিচে কয়েকজন বিশিষ্ট আলেম ও বক্তার নাম এবং তাঁদের অবস্থানের ধরন উল্লেখ করা হলো:
তিনি কওমি ধারার আলেমদের মধ্যে জামায়াতবিরোধী অবস্থানের প্রধান সারির নেতা। সম্প্রতি ২০২৬-এর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তিনি সরাসরি বলেছেন:
শায়খ আহমাদুল্লাহ সরাসরি রাজনৈতিক কাদা-ছোড়াছুড়িতে অংশ না নিলেও তাঁর অবস্থান অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ এবং জামায়াতের রাজনৈতিক প্রস্তাবের ক্ষেত্রে তিনি সতর্ক।
মুফতি আমির হামজা তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর কিছু রাজনৈতিক কৌশলের সমালোচনা করেছেন, আবার কখনো কখনো নমনীয় অবস্থানও নিয়েছেন।
আজহারী তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তাঁকে বিভিন্ন সময় তাঁদের প্ল্যাটফর্মে আসার প্রস্তাব দেওয়া হলেও তিনি সরাসরি তাঁদের দলে যোগ দেননি।
তিনি সরাসরি রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা না করলেও ইসলামের নামে রাজনৈতিক বিভাজন এবং চরমপন্থার বিরুদ্ধে কথা বলেন। তিনি কওমি ও সালাফি মতাদর্শের অনুসারী আলেমদের সাথে সমন্বয় করে চলার চেষ্টা করেন, যা জামায়াতের রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে একটি স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছে।
| আলেমদের ধারা | বিরোধিতার প্রধান কারণ |
| কওমি আলেম (হেফাজত-পন্থি) | মওদুদী সাহেবের লেখা বইয়ে সাহাবী ও নবীদের নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যের অভিযোগ। |
| আহলে সুন্নাত (সুফিবাদী) | জামায়াতকে ‘ওহাবী’ বা সংস্কারবাদী মনে করে এবং তাদের মাজার ও পীর প্রথার বিরোধী হিসেবে দেখে। |
| নিরপেক্ষ দাঈ (আহমাদুল্লাহ/আজহারী) | দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে দাওয়াতের কাজকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া। |
(এই প্রতিবেদনটি বিভিন্ন ইসলামী পণ্ডিতদের জনসম্মুখে দেওয়া বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে তৈরি করা হয়েছে। এটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করে না।)