মনির আহমদ আজাদ।।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো জাতি কেবল বাইরের আক্রমণে দুর্বল হয়ে পড়ে না; অভ্যন্তরীণ বিভক্তিও একটি জাতির শক্তিকে ক্ষয় করে। মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসেও এই বাস্তবতা বারবার প্রতিফলিত হয়েছে। আজকের বিশ্বেও মুসলিম সমাজের সামনে যে চ্যালেঞ্জগুলো বিদ্যমান, তার মধ্যে অন্যতম হলো পারস্পরিক বিভাজন, মতবিরোধের অসহনশীলতা এবং একে অপরকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার প্রবণতা।
ইসলামে মতভেদ নতুন কিছু নয়। সাহাবায়ে কেরামের যুগেও বিভিন্ন বিষয়ে ইজতিহাদি মতপার্থক্য ছিল। কিন্তু সেই মতপার্থক্য কখনো ভ্রাতৃত্ববোধকে ধ্বংস করেনি। কারণ তাঁদের কাছে ইসলামের মৌলিক ঐক্য ছিল সর্বাগ্রে, ব্যক্তিগত বা দলীয় অবস্থান নয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমান সময়ে কখনো কখনো মতের পার্থক্য এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে একজন মুসলমান আরেকজন মুসলমানের পরিচয়কে ছোট করে দেখেন বা তাকে প্রতিপক্ষ হিসেবে উপস্থাপন করেন।
কোনো মুসলমানের ধর্মীয় চর্চায় ভুল বা ভিন্ন ব্যাখ্যা থাকলে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে যুক্তি, প্রজ্ঞা ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে তাকে সত্য তুলে ধরা ইসলামের শিক্ষা। কিন্তু কাউকে অপমান করা, বিদ্বেষ ছড়ানো বা বিভক্তিকে আরও গভীর করা ইসলামের দাওয়াতি পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সত্য গ্রহণ করা বা না করা শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির দায়িত্ব, আর চূড়ান্ত বিচার আল্লাহ তাআলার হাতে।
আজ মুসলিম সমাজে নানা পরিচয়—শিয়া, সুন্নি, দেওবন্দি, সালাফি, কওমি কিংবা অন্য কোনো ধারার অনুসারী। এসব পরিচয় ইসলামের ইতিহাসে বিদ্যমান বাস্তবতা। কিন্তু যখন এই পরিচয়গুলো মুসলমানের মূল পরিচয়কে ছাপিয়ে যায়, তখন ঐক্যের ভিত্তি দুর্বল হতে শুরু করে। একজন মুসলমানের প্রথম পরিচয় হওয়া উচিত—তিনি মুসলমান। এরপর মত, মাযহাব বা প্রতিষ্ঠানের পরিচয় আসতে পারে।
বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতায় বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধ, দখল, সশস্ত্র সংঘাত ও মানবিক বিপর্যয়ের শিকার হচ্ছেন অসংখ্য মানুষ, যার মধ্যে মুসলমানও রয়েছেন। তবে এসব সংকটের কারণ একমাত্র ধর্ম নয়; বরং ভূ-রাজনীতি, রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবুও এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, কোনো সমাজ অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত হলে তার সম্মিলিত সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সংকট মোকাবিলার ক্ষমতাও কমে যায়।
এ কারণে মতভেদের সংস্কৃতি নয়, সংলাপের সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। কুরআন মুসলমানদের আল্লাহর রজ্জু দৃঢ়ভাবে ধারণ করতে এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। এই নির্দেশনা কেবল ধর্মীয় অনুশাসন নয়; এটি সামাজিক ও সভ্যতাগত শক্তিরও ভিত্তি।
ঐক্য মানে একরকম চিন্তা নয়, বরং ভিন্নমতকে সম্মান করে একটি অভিন্ন লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে এগিয়ে যাওয়া। ইসলামের মৌলিক আকিদা, ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে মুসলিম সমাজ যদি নিজেদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে, তবে বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাও সহজ হবে।
মতের পার্থক্য থাকবে, গবেষণা থাকবে, বিতর্কও থাকবে। কিন্তু সেই বিতর্ক যেন শত্রুতা সৃষ্টি না করে; বরং জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও সৌহার্দ্যের মাধ্যমে সত্য অনুসন্ধানের পথ খুলে দেয়। বিভক্তির দেয়াল যত উঁচু হবে, মুসলিম সমাজ তত দুর্বল হবে। আর পারস্পরিক সম্মান ও সংহতির ভিত্তি যত মজবুত হবে, ততই শক্তিশালী হবে মুসলিম উম্মাহর অবস্থান।
আজ প্রয়োজন মতের নয়, মননের পরিবর্তন; বিভাজনের নয়, সংহতির রাজনীতি; বিদ্বেষের নয়, ভ্রাতৃত্বের চর্চা। কারণ একটি ঐক্যবদ্ধ, জ্ঞানভিত্তিক ও ন্যায়নিষ্ঠ মুসলিম সমাজই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে।