সাকিব আহসান
প্রতিনিধি,পীরগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
যে শিক্ষা মানুষ গড়ার কারখানা হওয়ার কথা, তা ক্রমেই পরিণত হচ্ছে বাণিজ্যের যন্ত্রে। এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের একটি অংশ প্রকাশ্যেই কোচিং বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ায় এই সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে। নিয়মনীতি, নৈতিকতা কিংবা রাষ্ট্রের দেওয়া দায়িত্ব—কিছুই যেন তাদের কাছে আর বাধা নয়। শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে প্রকৃত শিক্ষা দেওয়ার বদলে তাদের জিম্মি করে কোচিং সেন্টারে টানাই এখন অনেকের প্রধান লক্ষ্য।
পীরগঞ্জের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে যে চিত্র উঠে এসেছে, তা উদ্বেগজনক। অভিযোগের তীর বিশেষভাবে গেছে ১১ নং বৈরচুনা মহেশপুর মাদ্রাসার শিক্ষক আওয়াল এবং ৭ নং হাজীপুরে ভেবড়া বোর্ডেরহাট ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার জাহিরুল ইসলাম, ডিএন ডিগ্রী কলেজের পদার্থ প্রদর্শক হযরত দিকে। হযরত আলী ও তার ভাই আমজাদ আলী পীরগঞ্জে যে কোচিং বাণিজ্যের সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে, তারা সেই সামাজ্যের সম্রাট ও সেনাপতি।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, এদের মতো আরও কয়েকজন শিক্ষক নিয়মিত ক্লাসে পাঠদানে গাফিলতি করে শিক্ষার্থীদের কোচিংয়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন।
একজন অভিভাবকের ভাষ্য, “স্কুলে-মাদ্রাসায় বেতন দিয়ে সন্তান পড়াই এই আশায় যে ওখানেই সে মূল শিক্ষা পাবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, ক্লাসে স্যাররা ঠিকমতো পড়ান না, বলেন কোচিংয়ে আসলেই সব বুঝিয়ে দেবেন। না গেলে নম্বর কম, পরীক্ষায় ফেল করার ভয় দেখানো হয়।” এই বক্তব্য শুধু একজনের নয়—পীরগঞ্জের বহু অভিভাবকের দীর্ঘশ্বাসের প্রতিধ্বনি।
একজন নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানায়, “ক্লাসে স্যাররা অনেক সময় বই খুলতেই বলেন না। পরে বলেন, ‘এটা কোচিংয়ে দেখাব।’ কোচিংয়ে না গেলে আমরা পিছিয়ে পড়ি। বাধ্য হয়েই যেতে হয়।” অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা আর স্বেচ্ছায় নয়, একপ্রকার বাধ্য হয়েই এই বাণিজ্যের শিকার হচ্ছে।
স্থানীয় এক সচেতন নাগরিকের ভাষ্য আরও তীক্ষ্ণ, “এটা শুধু কোচিংয়ের প্রশ্ন নয়, এটা পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করার একটা প্রক্রিয়া। যখন শিক্ষকই জ্ঞানের বদলে ব্যবসাকে প্রাধান্য দেন, তখন শিক্ষার্থীরা শিখবে কী? ভবিষ্যতে আমরা কী ধরনের নাগরিক পাব?” এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই বোঝা যায়, সমস্যাটি কতটা গভীরে প্রোথিত।
আরেকজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের সময় শিক্ষকতা ছিল ব্রত। এখন অনেকের কাছে এটা বিনিয়োগ—ক্লাসে কম দিলে কোচিংয়ে বেশি পাওয়া যাবে। এই মানসিকতা পুরো প্রজন্মকে ঠকাচ্ছে।” তার এই কথায় ফুটে ওঠে পেশাগত নৈতিকতার অবক্ষয়ের করুণ ছবি।
নীতিমালায় স্পষ্ট বলা আছে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নিজস্ব কোচিংয়ে পড়াতে পারবেন না, কিংবা পাঠদানে অবহেলা করতে পারবেন না। কিন্তু বাস্তবে এই নিয়মের প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। প্রশাসনের তদারকি দুর্বল, আর সেই সুযোগেই কিছু শিক্ষক প্রকাশ্যে কিংবা আড়ালে এই বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। এর ফল হচ্ছে ভয়াবহ—শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে যাচ্ছে, গরিব-সচ্ছল বিভাজন আরও তীব্র হচ্ছে, এবং মেধা নয়, টাকার জোরে টিকে থাকার এক বিকৃত সংস্কৃতি গড়ে উঠছে।
পীরগঞ্জের শিক্ষাব্যবস্থা আজ যেন ঘুণে ধরা বাঁশ—বাইরে দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু ভেতরে ফাঁপা। এই অবস্থার জন্য দায় এড়ানোর সুযোগ নেই সেইসব শিক্ষকদের, যারা নিজেদের দায়িত্ব ভুলে বাণিজ্যে মেতেছেন। একই সঙ্গে দায় আছে প্রশাসনেরও, যারা চোখ বন্ধ করে আছে।
এখনই যদি কঠোর নজরদারি, স্বচ্ছ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে এই অবক্ষয় আরও ছড়িয়ে পড়বে। শিক্ষা বাঁচাতে হলে আগে শিক্ষাকে ব্যবসা বানানোর এই প্রবণতাকে রুখতে হবে। নইলে পীরগঞ্জ নয়, পুরো সমাজই একদিন জ্ঞানহীনতার অন্ধকারে তলিয়ে যাবে।