বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়বেলায় শিক্ষা প্রশাসনে নজিরবিহীন তৎপরতা এবং বড় ধরণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার তোড়জোড় ঘিরে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। মেয়াদের মাত্র শেষ দুই কর্মদিবসে শিক্ষা আইন অনুমোদন এবং ১ হাজার ৭১৯টি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত করার প্রক্রিয়া নিয়ে খোদ মন্ত্রণালয়ের ভেতরে-বাইরে দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
সাধারণত নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে বা বিদায়ী সরকারের সময়ে এ ধরণের দীর্ঘমেয়াদী এবং জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার রীতি নেই। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় তড়িঘড়ি করে এসব ফাইল চূড়ান্ত করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে, যা নিয়ে শিক্ষা অধিকার সংসদসহ ৯৯৯ জন বিশিষ্ট শিক্ষক ও অভিভাবক সংগঠনগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন।
সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ১ হাজার ৭১৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সরকারি বেতন কাঠামোর (এমপিও) আওতায় আনা নিয়ে। অভিযোগ উঠেছে, এই তালিকার পেছনে কয়েকশ কোটি টাকার আর্থিক লেনদেন হয়েছে। প্রতিষ্ঠানভেদে ১২ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার তথ্য সামনে এসেছে।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, মাত্র আট দিনে ৩ হাজার ৬১৫টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলছেন, এত অল্প সময়ে প্রতিষ্ঠানের বৈধতা, পাসের হার ও অবকাঠামো যাচাই করা প্রায় অসম্ভব। এই বিতর্কের মুখে কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগ তাদের এমপিও আবেদন প্রক্রিয়া সাময়িকভাবে স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে।
গত ১৫ বছর ধরে বিভিন্ন মহলের আপত্তির মুখে ঝুলে থাকা ‘শিক্ষা আইন’ পাসের শেষ চেষ্টা চালাচ্ছে বর্তমান প্রশাসন। সোমবারই এটি উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে তোলার কথা রয়েছে। শিক্ষাবিদ রাশেদা কে চৌধুরীসহ সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, যে আইন দেড় দশকেও ঐকমত্যের অভাবে পাস করা যায়নি, তা বিদায়বেলায় অংশীজনদের সাথে আলাপ না করে পাসের তাড়াহুড়ো কেন?
শিক্ষা প্রশাসনের এই অস্থিরতা নতুন নয়। এর আগে নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার ঠিক আগের রাতে ৫২৫ জন ক্যাডার কর্মকর্তাকে নজিরবিহীনভাবে বদলি করা হয়েছিল, যাকে অনেকেই ‘বদলির চাঁদরাত’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। এছাড়া অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষ নিয়োগের ক্ষমতা এনটিআরসিএ-র হাতে দেওয়ার সিদ্ধান্তটিও এই সময়েই নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয় অবশ্য এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, পুরো প্রক্রিয়াটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে স্বচ্ছতার সাথে করা হয়েছে এবং দুর্নীতির অভিযোগগুলো অসত্য। তবে রাজনৈতিক সরকার আসার ঠিক আগমুহূর্তে প্রশাসনের এমন ‘রকেট গতির’ কাজ শিক্ষা খাতের স্বচ্ছতাকে বড় ধরণের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।