বাঘারপাড়া প্রতিনিধি। দীর্ঘ ৪ বছরেও পেনশনের টাকা না পাওয়া অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক নজরুল ইসলামের স্ত্রী তহুরা খাতুন (৪৭)অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় মারা গেলেন।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
বুধবার (১২ জুন) সকাল ১০টার দিকে তিনি গুরুতর অসুস্থ হলে যশোর জেনারেল হাসপাতালে নেয়া হয়। পরে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত চিকিৎসক তোহরা খাতুনকে মৃত ঘোষণা করেন। শিক্ষক নজরুল ইসলাম নিজেই তার স্ত্রী তোহরা খাতুনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক শিক্ষক নজরুল ইসলাম যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার নারিকেলবাড়িয়া ইউনিয়নের উত্তর শ্রীরামপুর গ্রামের বাসিন্দা। তিনি এমপিওভুক্ত খানপুর দাখিল মাদরাসার সহকারী শিক্ষক ছিলেন। তিনি দীর্ঘ ৩৫ বছর মাধ্যমিক বিদ্যালয় এবং একটি এমপিও দাখিল মাদরাসায় শিক্ষকতা করেছেন। বছর চারেক আগে অবসরে যান এই শিক্ষক। শিক্ষক জীবনে তার হাতে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হয়েছে। শিক্ষা দিয়ে তিনি অনেকেরজীবনের পরিবর্তন ঘটালেও তার নিজের জীবন এখন চরম সংকটাপন্ন অবস্থায়। অবসরপ্রাপ্ত এই শিক্ষক অবসরে যাওয়ার পরে আজ পর্যন্ত পেনশনের টাকা পাচ্ছেন না। পেনশনের টাকা না পাওয়ায় চিকিৎসা বন্ধ হয়েছিল শিক্ষক নজরুল ইসলামের শয্যাশায়ী অসুস্থ স্ত্রী ও কন্যার। পেনশনের টাকার জন্য দারে দারে ঘুরতে হয়েছে এই মানুষ গড়ার কারিগরকে।
শুক্রবার (১৪ জুন) সকালে শিক্ষক নজরুল ইসলামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের মধ্যে অস্বাভাবিক আচরণ করছেন তার মানসিক ভারসাম্যহীন মেয়ে রুমা খাতুন (২৫)। মা না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছে এ বিষয়টি যেন তার বোঝার ক্ষমতা নেই। রুমা খাতুন গত চার বছর ধরে মানসিক রোগে ভুগছেন।
শিক্ষক নজরুল ইসলামের দুই কক্ষ বিশিষ্ট অর্ধপাকা একটি টিনের ঘর রয়েছে। যার একটি কক্ষে তার অসুস্থ স্ত্রী তহুরা খাতুন (৪৭) অপর কক্ষে অসুস্থ মেয়ে রুমা খাতুন (২৬) শয্যাশায়ী। তার স্ত্রী তহুরা খাতুন ছয় মাস ধরে শরীরের মাংস পচন রোগে ভুগছিলেন। অপরদিকে মেয়ে রুমা খাতুন স্নাতক পাস করার পর গত চার বছর ধরে তিনি মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়েছেন। স্ত্রী এবং মেয়ের ওষুধের টাকা জোগাড় করতে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছোটাছুটি করতে হয় শিক্ষক নজরুলকে। আবার পেনশনের টাকার জন্য তাকে বার বার ধরনা দিতে হয়েছে বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) প্রতিষ্ঠানে। অবশেষে পেনশনের টাকাও পেলেন না তিনি, অপরদিকে অর্থের অভাবে বিনা চিকিৎসায় হারালেন স্ত্রীকে।
শিক্ষক নজরুল ইসলাম জানান, তিনি ১৯৮২ সাল থেকে শ্রীরামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। সেখানে সহকারী প্রধান শিক্ষক হিসেবে দুই বছর দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ১৯৮৪ সালে বাঘারপাড়ার এমপিওভুক্ত খানপুর দাখিল মাদরাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন তিনি। সেখান থেকে গত ২০২০ সালের ২১ জুন অবসর গ্রহণ করেন শিক্ষক নজরুল। অবসরে যাওয়ার পর কল্যাণ তহবিলের ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা পেলেও আজ পর্যন্ত পেনশনের একটি টাকাও পাননি তিনি।
তিনি বলেন, ‘অর্থের অভাবে আমার অসুস্থ স্ত্রী এবং মেয়ের চিকিৎসা বন্ধ হয়ে আছে। তাদের প্রতি মাসে চিকিৎসা সেবার জন্য ১০-১৫ হাজার টাকা প্রয়োজন হয়। তাদের চিকিৎসা করানো তো দূরের কথা তিনবেলা ভাতের ব্যবস্থা করার মতো সামর্থ্যও নেই আমার। বাঘারপাড়ার একটি এনজিওতে তিন হাজার টাকা বেতনে একটি চাকরি নিয়েছি। তাই দিয়ে আপাতত কোনো রকম ডালভাত খেয়ে বেঁচে আছি।
তিনি আরও বলেন, ‘আমার দুই ছেলে, তারা যে যার মতো আলাদা থাকে। তাদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি নিজেও সড়ক দুর্ঘটনার রোগী। আমার পরিবারে আমিসহ তিনজন সদস্য আমরা তিনজনই রোগী। পেনশনের টাকার জন্য কয়েকবার ঢাকার ব্যানবেইসে গিয়েছি। সেখান থেকে আমার কাগজপত্র অস্পষ্ট বলে ফিরিয়ে দিয়েছে।
খানপুর দাখিল মাদরাসার সহকারী সুপার খাইরুল ইসলাম ঢাকা পোস্টকে বলেন, শিক্ষক নজরুল ইসলামের অবসরের সকল কাগজপত্র একাধিকবার ঢাকার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। তবে ঊর্ধ্বতন দপ্তরের গাফিলতির কারণে পেনশনের টাকা পেতে বেগ পেতে হচ্ছে শিক্ষক নজরুলকে।
শিক্ষক নজরুল ইসলাম আরও বলেন, ঢাকায় যাওয়ার মতো অর্থও আর আমার নেই। আমার কাগজপত্রগুলো পুরাতন হয়ে যাওয়ার ব্যান বেইস আমাকে বার বার ফিরিয়ে দিচ্ছে। আমি আকুতি মিনতি করলেও আমার পেনশনের টাকার কোনো ব্যবস্থা তারা করেনি। আমার প্রতি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দৃষ্টি দেয়ার জন্য অনুরোধ করছি।
তিনি বলেন, আমার ছাত্র অনেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হয়ে দেশবিদেশে চাকরি করছে। কেউ আজ পর্যন্ত আমার খোঁজখবর নেয়নি। সম্প্রতি আমি ফেসবুকে লাইভে এসে আমার জীবন দশার কথা বললে, অনেকে যোগাযোগ করেছে, সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে, কিন্তু কেউ এখনো সহযোগিতা করেনি।