দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
যোবায়ের হোসেন জাকির, জাবি প্রতিনিধি।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমানের বৃহস্পতিবারের (২৫ ডিসেম্বর) ভাষণকে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের ঐতিহাসিক গেটিসবার্গের ভাষণের সঙ্গে তুলনা করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) শাখা জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক শামসুল আলম।
রবিবার (২৮ ডিসেম্বর) রাতে এক সাক্ষাৎকারে অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, “জাতীয় ঐক্য ও ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের দিকনির্দেশনার ক্ষেত্রে তারেক রহমানের ভাষণটি ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করে।”
তিনি বলেন, “যেভাবে আব্রাহাম লিংকন গেটিসবার্গের ভাষণে জাতিকে ঐক্যের পথে আহ্বান জানিয়েছিলেন, তেমনি করে তারেক রহমান আজ সবাইকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।”
দীর্ঘ ১৭ বছরের প্রবাস জীবন শেষে বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর পূর্বাচল ৩০০ ফিট এলাকায় আয়োজিত এক সংবর্ধনা সমাবেশে অংশ নেন তারেক রহমান। সেখানে দেওয়া তাঁর ভাষণ দেশের রাজনীতিতে নতুন দিশা তৈরি করেছে বলে মন্তব্য করেন অধ্যাপক শামসুল আলম।
অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, “দেশে দীর্ঘদিন ধরে যে নেতৃত্ব সংকট চলছিল, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে তা অনেকাংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে। তাঁর আগমনে দেশের রাজনীতিতে নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ হয়েছে এবং আগামী দিনের বাংলাদেশ নতুন পথ খুঁজে পেয়েছে।”
অধ্যাপক শামসুল আলম আরও বলেন, “তারেক রহমান তরুণ সমাজকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে চান এবং তিনি জাতীয় ঐক্যের বার্তা দিয়েছেন। দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি সবাইকে সতর্ক থাকার কথা বলেছেন, যেন কোনো অশুভ শক্তি দেশকে অস্থিতিশীল করতে না পারে।”
ভাষণে জুলাই আন্দোলনের শহীদ ওসমান হাদির হত্যার প্রসঙ্গ তুলে ধরার বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপক শামসুল আলম। তিনি বলেন, “তারেক রহমান দেশে ফিরে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুসসহ দেশের বিশিষ্টজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন, যা তাঁর দায়িত্ববোধ ও রাষ্ট্রচিন্তার পরিচয় বহন করে।”
বিমানবন্দরে নেমে দেশের মাটিতে পা রেখে জুতা খুলে মাটি স্পর্শ করার ঘটনাকে দেশের প্রতি গভীর মমত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, “তিনি এ দেশের সন্তান, দেশ ও মানুষের টানেই তিনি দেশে ফিরেছেন।”
অধ্যাপক শামসুল আরও বলেন, “তারেক রহমান আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি শহীদ জিয়াউর রহমানের মাজার, জাতীয় স্মৃতিসৌধ এবং জুলাই আন্দোলনে আহতদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার কথা বলেছেন। গণমানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ীই তিনি কাজ করতে চান।”
জাতীয় নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সাম্প্রতিক একাধিক জনমত জরিপে জনগণের আস্থার প্রতিফলন দেখা গেছে। তাঁর দাবি, জনগণ তারেক রহমানের নেতৃত্বকে গ্রহণ করেছে এবং আগামী জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির সরকার গঠনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, “নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পথে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।”
তবে একই সঙ্গে তারেক রহমানকে দলের ভেতরের সুযোগসন্ধানীদের বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান অধ্যাপক শামসুল আলম। তিনি বলেন, “দলের দুঃসময়ে যারা আন্দোলন-সংগ্রামে ছিলেন, তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। আমাদের বিশ্বাস, তিনি একজন পরিপক্ব নেতা হিসেবেই দেশে ফিরেছেন।”
মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, “একটি দল মুক্তিযুদ্ধকে নিজেদের সম্পত্তিতে পরিণত করার চেষ্টা করেছে, যার ফলে জাতি বিভক্ত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ ছিল একটি ব্যাপক গণযুদ্ধ। রাজনৈতিক দল, সাধারণ মানুষ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাতেই স্বাধীনতা এসেছে। কিন্তু পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধকে এককভাবে উপস্থাপনের কারণে ঐক্য ক্ষুণ্ন হয়েছে।”
তিনি বলেন, “ঐক্যের অভাবেই বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি, যেখানে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো দেশ অনেক এগিয়ে গেছে। বিজয় দিবস আমাদের সেই ঐক্যের শিক্ষাই দেয়।”
মুক্তিযুদ্ধের দুই অগ্রনায়ক শেখ মুজিবুর রহমান ও জিয়াউর রহমানের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, “৭ মার্চের ভাষণে জনগণ স্বাধীনতার স্পষ্ট ঘোষণা প্রত্যাশা করেছিল। কিন্তু তা আসেনি। বিভিন্ন গবেষণা ও লেখালেখিতে—বিশেষ করে বদরউদ্দিন উমরের গ্রন্থে—এই বিষয়টি উঠে এসেছে।”
তিনি আরও বলেন, “২৫ মার্চের গণহত্যার পরও রাজনৈতিক সমাধানের আলোচনা চলছিল। সেই সংকটময় মুহূর্তে সেনা কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান এগিয়ে আসেন এবং কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। এই নেতৃত্ব মুক্তিযুদ্ধকে দিকনির্দেশনা দেয়।”
স্বাধীনতার পর দেশ গঠনেও জিয়াউর রহমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, পরিকল্পিতভাবে গত ১৬ বছরে জিয়াউর রহমানকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে, যা দুঃখজনক।
অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, “শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন একজন প্রভাবশালী বক্তা, যাঁকে জনগণ বিশ্বাস করেছিল। তবে সেই বিশ্বাসের যথাযথ মূল্যায়ন নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। ইতিহাসকে সমন্বিত ও সত্যনিষ্ঠভাবে তুলে ধরাই জাতির জন্য জরুরি।”