সাকিব আহসান
পীরগঞ্জ,ঠাকুরগাঁও
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
পীরগঞ্জ উপজেলার বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলো আজ এক জটিল দাপ্তরিক চক্রে আটকে আছে। গুটি কয়েক প্রতিষ্ঠানের গাছেড়ে দেওয়ার স্বভাবও আছে। যেহেতু বৈধ কাগজপত্র ছাড়া ক্লিনিকের যাবতীয় কার্যক্রম দেদারসে চলেছে দীর্ঘদিন ধরে কোনোরকম প্রশাসনিক জটিলতা ছাড়াই। বিষেশত,আধুনিক নার্সিং হোম লিঃ। বড্ড বেপরোয়া স্বভাব পরিলক্ষিত হয় এই নার্সিং হোমে। কারণ, অজুহাত তো আছেই। যেমন আবেদন করেছি,অধিদপ্তর কাগজ দেয়না,মন্ত্রণালয় কাগজ দেয় না ইত্যাদি।
একদিকে জনসাধারণের বাড়তে থাকা চিকিৎসা চাহিদা, অন্যদিকে কঠোর আইন ও দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া—এই দুইয়ের মাঝে পড়ে অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যত অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এই জটিলতার দায় কার? প্রশাসনের, নাকি উদ্যোক্তাদের?
বাংলাদেশে প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালিত হয় মূলত বেসরকারি চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠান আইন, ২০১০, বিধিমালা, ২০১১ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) নিয়মিত সার্কুলার ও স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রোসিডিউর (SOP) অনুযায়ী। আইনটি স্পষ্ট,লাইসেন্স ছাড়া কোনো ক্লিনিক বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনা করা একটি ফৌজদারি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষে। কিন্তু এই লাইসেন্স পেতে যে কাগজপত্র ও অনুমোদনের স্তর পার হতে হয়, তা অনেক সময় উদ্যোক্তাদের জন্য দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।
লাইসেন্স আবেদনের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয় নির্ধারিত আবেদন ফরম, ফি পরিশোধের চালান, প্রতিষ্ঠানের নাম-ঠিকানা, মালিকের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ছবি। পাশাপাশি ভবনের মালিকানা দলিল বা ভাড়ার চুক্তিপত্র, বিস্তারিত ফ্লোর লে-আউট প্ল্যান, যেখানে অপারেশন থিয়েটার, ওয়ার্ড, ল্যাব ও ওয়েটিং এরিয়ার অবস্থান পর্যন্ত দেখাতে হয়।
জনবল সংক্রান্ত শর্ত আরও কঠোর। রেজিস্টার্ড চিকিৎসকদের BMDC রেজিস্ট্রেশন, নার্সদের বাংলাদেশ নার্সিং কাউন্সিলের সনদ, টেকনোলজিস্টদের সংশ্লিষ্ট বোর্ডের অনুমোদন সবকিছু হালনাগাদ না থাকলে আবেদন আটকে যায়। যন্ত্রপাতির ক্ষেত্রেও একই অবস্থা। এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি বা সিটি স্ক্যানের মতো বড় যন্ত্র থাকলে রেডিওলজিক্যাল সেফটি ক্লিয়ারেন্স বাধ্যতামূলক।
এখানেই শেষ নয়। ইনফেকশন কন্ট্রোল ও মেডিকেল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট পরিকল্পনা না থাকলে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে Environmental Clearance Certificate পাওয়া যায় না। আবার ফায়ার সার্ভিসের অগ্নি নিরাপত্তা সনদ, পৌরসভার ট্রেড লাইসেন্স, TIN ও VAT রেজিস্ট্রেশন—প্রতিটি আলাদা দপ্তরের অনুমোদন ছাড়া লাইসেন্স প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয় না।
বিশেষায়িত ক্লিনিক যেমন ICU, ডায়ালাইসিস বা IVF সেন্টারের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত অনুমতির বিষয়টি প্রক্রিয়াকে আরও দীর্ঘ করে তোলে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান কাগজপত্র “প্রক্রিয়াধীন” রেখেই কার্যক্রম চালাতে বাধ্য হয়, যা আইনগতভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।
লাইসেন্সের মেয়াদ সাধারণত এক বছর। নবায়নের সময়ও একই রকম চাপ, পুরোনো লাইসেন্স, নবায়ন ফি, জনবল ও যন্ত্রপাতির হালনাগাদ তালিকা এবং পরিদর্শন রিপোর্ট জমা দিতে হয়।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, আইন প্রয়োগ যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োজন প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও সময়সীমা নির্ধারণ। নতুবা এই দাপ্তরিক জটিলতার সুযোগে একদিকে যেমন অবৈধ ক্লিনিক বাড়বে, অন্যদিকে ঝুঁকির মুখে পড়বে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা।
পীরগঞ্জের বাস্তবতায় প্রশ্নটা তাই আরও তীক্ষ্ণ যে আইনের কড়াকড়ি কি জনস্বাস্থ্য রক্ষার হাতিয়ার হবে, নাকি কেবল দপ্তরের ফাইলে আটকে থাকা আরেকটি অদৃশ্য সংকট?