ডেস্ক রিপোর্ট।।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
‘৬০ বছর আগে এই গেরামেই আমার বিয়াসাদি হইছে। পোলামাইয়া এই গেরামেই বড় হইছে। এহন পোলাডা বিয়া করছে। হের একটা আবুইদ্যা (সন্তান) হইছে। এই ৬০ বছরের মইধ্যে গেরামে কেউ কোরবানি দিছে বইল্যা আমার জানা নাই। ঈদের দিন এই গেরামের বেডা-বেডি, পোলা-বোড়া যা আছে সবাই সকালবেলা ঘর থেইক্যা বাইর হই। সারাদিন মাইনসের বাড়ি বাড়ি গিয়া মাংস খুইজ্জা আনি। সারাদিনে যা পাই তা নিয়া বাড়িত আই সন্ধ্যাবেলা। এই মাংসই আমরার কোরবানির মাংস।’
কথাগুলো বলছিলেন ৬০ বছরের বৃদ্ধা শাহেদা বেগম। দুই দিন ধরে সরেজমিনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার কুন্ডা ইউনিয়নের রানিয়াচং গ্রামে গিয়ে এ তথ্য জানা গেছে।
জানা গেছে, উপজেলার কুন্ডা ইউনিয়নের রানিয়াচং গ্রামে ৬০ বছরের মধ্যে কখনও পশু কোরবানি হয়নি। এই গ্রামে জন্ম নিয়ে অনেকেই বৃদ্ধ হয়েছেন, কিন্তু পশু কোরবানি হতে দেখননি কেউই। তারা কোরবানির ঈদকে উপলব্ধি করে আসছেন ভিন্ন স্বাদে।
এই গ্রামে প্রায় ৪০০ পরিবারের ১ হাজার ২০০ বাসিন্দা আছে। যাদের সবাই দিনমজুর। ইটভাটার কাজই তাদের প্রধান জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন। ঈদের দিন বাড়ি-বাড়ি চাল তুলে একজন ইমাম নিয়ে এসে নামাজ পড়ানো হয় গ্রামের একটি মক্তবে। এরপর যে যার মতো মাংসের খুঁজে বের হয়ে পড়েন। অন্য দিনের চেয়ে ঈদের দিনের পার্থক্য শুধু ওই সকালের নামাজটুকুই।
এখানকার নারী-পুরুষেরা নতুন পাঞ্জাবি-শাড়ি পরাতো দূরের কথা, শিশুদের শরীরে থাকে না কোনো জামা-কাপড়। যারা বসতি করে আছে তাদের নেই নিজের কোনো জায়গা-জমি। সরকারি খাস জায়গায় ঘর করে আছেন প্রায় ৬০ বছর ধরে।
ওই গ্রামের ৬০ বছরের বৃদ্ধা অনুফা বেগম বলেন, ‘আমরা সবাই ভূমিহীন। সরকারের জাগাত থাহি। ৫০ থেকে ৬০ বছরের মইদ্যে এই গেরামে কোনো গরু কোরবানি হয়ছে না। ঈদের দিন আমরা গোসল কইরা সকালে বাড়িত থেইক্যা বাইর হমু। সারাদিন গোশত সংগ্রহ কইরা বাড়িত আইলে রাইতে রাইন্দা পোলা-মাইয়া লইয়া খামু।’
হুমায়ুন কবির নামে একজন জানান, ‘কোরবানি দিমু কইত্যয়, সরকারি জাগাত থাকি। বন্যায় ঘর-দুয়ার লাইছে ভাইঙ্গা। এহন থাহি আকাশের নিছে। আমরার আবার ঈদ কিতা! ভাত খাইয়া বাচুম নি এই চিন্তায় ঘুম আইয়ে না।’
আব্দুল আলেক মিয়া নামে ৭০ বছরের এক বৃদ্ধ আক্ষেপ নিয়ে বলেন, ‘৭০ বছর ধইয়া আমি এই গেরামে বাস করতাছি। নিজের কোনো জায়গা-জমি নাই। আমরা খুবই গরিব মানুষ। আমার জীবনে এই গেরামে গরু কোরবানি দিতে দেখছি না।’
কুন্ডা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মো. নাছির উদ্দিন ভূইয়া বলেন, রানিয়াচং গ্রামে ৬০ বছর ধরে কোনো পশু কোরবানি হয়নি বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে এই গ্রামের মানুষ খুবই গরিব এটা জানি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মো. মোনাব্বর হোসেন বলেন, এই গ্রামের যারা ভূমিহীন ও গৃহহীন তাদের সরকারি ঘরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আরও যারা পাওয়ার যোগ্য তাদেরও পর্যায়ক্রমে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় আনা হচ্ছে। কয়েকদফা ওই গ্রামে সরকারি ত্রাণ দেওয়া হয়েছে। কোরবানি দেয় না ওই গ্রামের মানুষ, বিষয়টি জানা ছিল না। সমকাল