খ ম জায়েদ হোসেন, নাসিরনগর
(ব্রাহ্মণবাড়িয়া) প্রতিনিধি।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
নাতন ধর্মের অনুসারীদের সবচেয়ে বড় উৎসবের শেষ লগ্ন এখন। চোখের জলে তারা মায়ের আসনে বসানো দেবীকে বিদায় জানাচ্ছেন।
টানা ৬ দিনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে মঙ্গলবার মর্ত্যলোক থেকে বিদায় নিলেন শারদীয় দেবী দুর্গা।
দশভূজা দেবী দুর্গা অসুর বধ করে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শরতে শরতে কৈলাস ছেড়ে কন্যারূপে মর্ত্যলোকে আসেন। সন্তানদের নিয়ে পক্ষকাল পিতার গৃহে কাটিয়ে ফিরে যান দেবালয়ে।
সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে প্রতিমা বিসর্জনের জন্য বিভিন্ন নদী কূলবর্তী স্থানগুলোতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মণ্ডপে মণ্ডপে তাই এখন বিদায়ের সুর।
বুধবার ২১অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকার প্রতিমাগুলো মেঘনা, লঙ্ঘন, বলভদ্র ও বেমালিয়া নদীগুলোতে বিসর্জন দেয়া হয়েছে।হাজার হাজার ভক্তের উপস্থিতিতে ঢাক ও কাঁসর ঘণ্টা বাজিয়ে ট্রাকে করে, কোথাও নৌকাযোগে প্রতিমাগুলো বিসর্জন দেয়া হচ্ছে। যেখানে নদী নেই সেখানে খাল, বিল বা বড় পুকুরেও হবে বিসর্জনের এই প্রক্রিয়া।
দেবী দুর্গা শক্তিদায়িনী অভয়দায়িনী। যুগে যুগে বিভিন্ন সংকটের সময় তিনি মর্ত্য ধামে আবির্ভূত হয়েছেন বিভিন্ন রূপে, বিভিন্ন নামে। তাই তিনি আদ্যাশক্তি, ব্রহ্মা সনাতনী। দুর্গা, মহিষ মর্দিনী, কালিকা, ভারতী, অম্বিকা, গিরিজা বৈষ্ণবী, কৌমারী, বাহারী, চন্ডী লক্ষ্মী, উমা, হৈমবতী, কমলা, শিবানী, যোগনিদ্রা নামেও পূজিতা।
এদিন সন্ধ্যার আগেই উপজেলার সব মণ্ডপের প্রতিমার বিসর্জন সম্পন্ন হতে পারে বলে জানিয়েছে পূজা উদযাপন কমিটি।
সকালে শেষবারের মতো দেবীকে দর্শন ও পূজা করতে পূজা মণ্ডপগুলোতে ভিড় জমান ভক্তরা।
আগামী শরতে আবার বাঙালি হিন্দুর ঘরে ঘরে ফিরে আসবেন মা দুর্গা সে কামনাতেই থাকবেন তারা।
ত্রেতাযুগে ভগবান রাম তার স্ত্রী সীতাকে উদ্ধার করতে দেবী দুর্গার অকালবোধন করেন। ব্রহ্মার নির্দেশ অনুযায়ী দুর্গার সাহায্যে রাবণ বধ করে সীতাকে উদ্ধার করেন তিনি। দেবীর সেই আগমণের সময়ই দুর্গোৎসব। রাম শরৎকালে দেবীকে আহ্বান করেছিলেন বলে এ পূজা শারদীয় দুর্গা পূজা নামেও পরিচিত।
এবার নাসিরনগর উপজেলায় ১৪২টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপিত হলো। শুক্রবার ষষ্ঠীতে বোধনের মাধ্যমে দেবীকে আমন্ত্রণ ও বরণ পালা শেষে প্রাণ প্রতিষ্ঠিত করা হয়। শনিবার অশুভ শক্তিকে শোধন করে সবকিছু শুদ্ধে পরিণত করার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মহাসপ্তমী।
রোববার মহা অষ্টমীতে দেবীর কল্পারম্ভ ও মহাষ্টমী বিহিত পূজা হয়। মঙ্গলবার শাস্ত্রীয় ও লগ্ন অনুযায়ী মহাবিজয়া। সকাল থেকেই উৎসব ও মাকে বিদায় দেয়ার সব ধরনের প্রস্তুতি নিতে দেখা যায় ভক্তদের মধ্যে।
মা দুর্গার কাঠামোতে জগজ্জননী দুর্গা ছাড়াও লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গনেশ, সিংহ ও অসুরের মূর্তি থাকে। এছাড়া, পেঁচা, হংস, ময়ূর, ইঁদুর ও সবার উপরে শিবের মূর্তি বিদ্যমান। লক্ষ্মী ধনের, সরস্বতী জ্ঞানের, গণেশ কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের প্রতীক। মা দুর্গার দশটি হাত ও দশটি প্রহরণ অপরিমেয় বলবীর্যের। সিংহ বশংবদ ভক্তের ও অসুর সমস্ত অশুভ ও দুর্গতির প্রতীক। দেব সেনাপতি কার্তিক তারকাসুরকে বধ করে স্বর্গভ্রষ্ট দেবতাদের পুনরায় স্বর্গে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। অতন্ত্র প্রহরায় রক্ষা করেছিলেন স্বর্গের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব।
শাস্ত্র বলছে, সপ্তমী, অর্থাৎ দেবীর আগমনের দিন শনি এবং ফেরার দিন মঙ্গলবার হওয়ায় এবার তার আসা-যাওয়া দুটোই হবে ঘোটকে, অর্থাৎ ঘোড়ায় চেপে। এর ফল হবে ‘ছত্রভঙ্গস্তুরঙ্গমে’। অর্থাৎ, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংসারিক ক্ষেত্রে ঘটবে অস্থিরতা। রাজনৈতিক উত্থান-পতন, সামাজিক স্তরে বিশৃঙ্খলা, অরাজকতা, গৃহযুদ্ধ, দুর্ঘটনা, অপমৃত্যু বাড়বে।
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা মতে আজ মঙ্গলবার বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হবে এবারের দুর্গোৎসব। একটি বছরের জন্য ‘দুর্গতিনাশিনী’ দেবী ফিরে যাবেন কৈলাসে দেবালয়ে।