টেলিগ্রাফ রিপোর্ট | কাউকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়া আপাতদৃষ্টিতে হঠকারী বা শিশুসুলভ আচরণ মনে হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাস।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
বিশ্বের নানা প্রান্তে ডিম নিক্ষেপ শুধু ক্ষোভ প্রকাশের একটি পদ্ধতি নয়; বরং এটি ক্ষমতার প্রতি অস্বীকৃতি, প্রকাশ্য অপমান এবং প্রতীকী প্রতিবাদের একটি সুপরিচিত ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে।
ডিম ছোড়ার ঐতিহাসিক পটভূমি
প্রাচীন গ্রিস ও রোমে জনসমক্ষে অপমান সামাজিক শাস্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ রূপ ছিল। অপছন্দের শাসক, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা কিংবা সমাজের চোখে গ্রহণযোগ্য নয়—এমন ব্যক্তিদের উদ্দেশে পচা ফল, সবজি বা ডিম ছুড়ে দেওয়া হতো। উদ্দেশ্য ছিল শারীরিক ক্ষতি নয়, বরং সম্মানহানি ও সামাজিক লজ্জা সৃষ্টি করা।
খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ অব্দে রোমান গভর্নর ভেসপাসিয়ানের করনীতি জনগণের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি করে। সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে তার দিকে শালগম নিক্ষেপের ঘটনা ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য হয়ে আছে।
ডিম ব্যবহারের লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায় এশিয়া মাইনরের কবি হিপোনাক্সের সময়কাল থেকে (খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী)। তার লেখায় দেখা যায়, অপরাধী বা সমাজচ্যুত ব্যক্তিদের সামাজিকভাবে হেয় করতে ডিম ও পচা খাবার ছোড়ার রীতি প্রচলিত ছিল।
এলিজাবেথীয়ান যুগে, বিশেষ করে শেক্সপিয়রের সময়ে, দর্শকরা কোনো অভিনেতার অভিনয় পছন্দ না হলে মঞ্চের দিকে পচা ডিম ছুড়ে প্রতিবাদ জানাত। উনিশ শতকে এসেও এই প্রবণতা রাজনৈতিক রূপ নেয়। জর্জ এলিয়টের উপন্যাস মিডলমার্চ-এ নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে ডিম নিক্ষেপের দৃশ্য সেই সময়ের রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রতিফলন।
মধ্যযুগীয় ইউরোপে ‘চারিভারি’ নামে পরিচিত গণ-উপহাসের রীতি ছিল। সমাজ যাদের অনৈতিক বা নিয়মভঙ্গকারী মনে করত, তাদের বাড়ির সামনে লোকজন জড়ো হয়ে হাঁড়ি-পাতিল পিটিয়ে তীব্র শব্দ করত।
অনেক সময় এই হট্টগোলের সঙ্গে পচা ডিম বা ময়লাও নিক্ষেপ করা হতো, যা এক ধরনের জনতার বিচার বা ‘মব জাস্টিস’ হিসেবে বিবেচিত ছিল। একইভাবে, পিলরিতে বন্দী অপরাধীদের ওপর ডিম ছোড়া ছিল প্রাতিষ্ঠানিক অপমানের অংশ।
আধুনিক রাজনীতিতে ডিম নিক্ষেপ
আধুনিক কালে ডিম ছোড়া একটি পরিচিত রাজনৈতিক প্রতিবাদে রূপ নেয়। ২০০১ সালে যুক্তরাজ্যের উপ-প্রধানমন্ত্রী জন প্রেসকট ডিম নিক্ষেপের শিকার হন। মার্গারেট থ্যাচার বিভিন্ন সময়ে ছাত্র আন্দোলন ও রাজনৈতিক বিক্ষোভে ডিম হামলার মুখে পড়েন। ১৯৯২ সালে নির্বাচনী প্রচারণার সময় জন মেজরের মুখে সরাসরি ডিম লাগে।
রাজপরিবারও এই প্রতীকী প্রতিবাদ থেকে রেহাই পায়নি। রাজা তৃতীয় চার্লস ইয়র্কে ও পরে লুটনে জনসমক্ষে ডিম নিক্ষেপের মুখে পড়েন। লন্ডনে টিউশন ফি বৃদ্ধিবিরোধী বিক্ষোভে রাজকীয় গাড়িতে ডিম ও রং নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটে।
যুক্তরাষ্ট্রে ২০০৩ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার নির্বাচনী প্রচারে আর্নল্ড শোয়ার্জনেগার ডিম হামলার শিকার হন। ভিয়েতনাম যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনসহ ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন দেশে বিতর্কিত সিদ্ধান্তের প্রতিবাদেও ডিম নিক্ষেপের নজির রয়েছে।
এসব ঘটনায় ডিম ছোড়া ছিল একটি স্পষ্ট বার্তা—ক্ষমতা ও মর্যাদার প্রতি অস্বীকৃতি।
কেন ডিমই ব্যবহৃত হয়
ডিম নিক্ষেপ সাধারণত মারাত্মক সহিংসতা নয়। এতে গুরুতর শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা কম, কিন্তু ডিমের আঠালো ভাব ও দুর্গন্ধ তাৎক্ষণিকভাবে অপমান ও লজ্জা তৈরি করে। সহজলভ্য ও সস্তা হওয়ায় এটি প্রতিবাদের কার্যকর মাধ্যম। এ কারণে সমাজবিজ্ঞানীরা একে ‘প্রতীকী সহিংসতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, যেখানে আঘাতের চেয়ে অপমান বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের আইনি অবস্থান
বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী ডিম নিক্ষেপ বিভিন্ন ধারায় অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে। ধারা ৩৫২ অনুযায়ী এটি আক্রমণ বা অপরাধমূলক বলপ্রয়োগ হিসেবে বিবেচিত হলে সর্বোচ্চ তিন মাস কারাদণ্ড বা জরিমানা হতে পারে। আঘাতের মাত্রা অনুযায়ী ৩৩৪ বা ৩২৩ ধারাও প্রযোজ্য হতে পারে।
প্রকাশ্য অপমান ও শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা থাকলে ৫০৪ ধারা, জনসাধারণের বিরক্তি সৃষ্টি করলে ২৯০ ধারা এবং সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হলে ৪৯৯ ও ৫০০ ধারায় মানহানির মামলার সুযোগ রয়েছে।
#