টেলিগ্রাফ রিপোর্ট | আসন্ন রমজান, জাতীয় নির্বাচন, সেচ কার্যক্রম এবং গ্রীষ্ম মৌসুমকে সামনে রেখে বিদ্যুতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে উল্লেখ করে অতিরিক্ত সরবরাহ নিশ্চিতে ৩৮ হাজার ৪৫১ কোটি টাকা ভর্তুকির দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
বিদ্যুৎ বিভাগে পাঠানো এক চিঠিতে সংস্থাটি সতর্ক করেছে, এই অর্থ বরাদ্দ না হলে আগামী মাস থেকেই দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিংয়ের মুখে পড়তে পারে দেশ। বেশি দামে বিদ্যুৎ ক্রয় করে কম দামে বিক্রি করতে হওয়ায় পিডিবি গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়েছে।
পিডিবির হিসাবে, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিদ্যুৎ খাতে সরকার মোট ১ লাখ ৪৩ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়েছে। তবুও সংস্থাটির লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ৪৫১ কোটিরও বেশি। এর ফলে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন বিদ্যুৎ কোম্পানির কাছে পিডিবির বকেয়া বেড়ে ৩৬ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পিডিবির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গণমাধ্যমকে জানান, অর্থের অভাবে কোনো বিদ্যুৎ কোম্পানিকেই সময়মতো বিল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। শীত মৌসুম শেষ হওয়ায় চাহিদা বাড়ছে, এ অবস্থায় অতিরিক্ত ভর্তুকি না পেলে নির্বাচনকাল, সেচ মৌসুম ও রমজানে দীর্ঘ লোডশেডিং অনিবার্য হতে পারে।
তবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদ প্রায় শেষ হওয়ায় নতুন করে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব নয়; বিষয়টি নতুন সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
পিডিবির সচিব মুহাম্মদ রাশেদুল হক প্রধান স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে এবং ২০২৩ সাল থেকে গ্যাসের দাম প্রতি ঘনমিটারে ৫ দশমিক ০২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫ দশমিক ৫০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুতের বিক্রিমূল্য অপরিবর্তিত থাকায় লোকসান আরও বেড়েছে। ভর্তুকি পাওয়ার পরও ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
পিডিবির দাবি, গ্যাস ও তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং আদানি, এসএস পাওয়ার, রামপাল ও পায়রাসহ কয়লাভিত্তিক কেন্দ্র থেকে তুলনামূলক বেশি দামে বিদ্যুৎ কেনার কারণে উৎপাদন খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ ১২ দশমিক ৩৫ টাকায় কিনে ৬ দশমিক ৬৩ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে, ফলে মাসে হাজার কোটি টাকার বেশি ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
জাতীয় বিদ্যুৎ খাত দুর্নীতি তদন্ত কমিটির মতে, পূর্ববর্তী সরকারের সময়ে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ৭৭০০ থেকে ৯৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল, যার কারণে বছরে প্রায় ১৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে।
দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি হলেও, বর্তমান চাহিদা মাত্র ১১ থেকে ১২ হাজার মেগাওয়াট। এরপরও রাজধানীর বাইরে নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে এবং সোমবার দুপুরে ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৪৬ মেগাওয়াট।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, ৮ থেকে ৯ মাস ধরে বিল পরিশোধ না পাওয়ায় অনেক কোম্পানি জ্বালানি তেল আমদানি, গ্যাস বিল পরিশোধ এবং ব্যাংক ঋণ শোধে ব্যর্থ হচ্ছে। দেনার কারণে ব্যাংক থেকে এলসি খোলাও কঠিন হয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো অথবা ভর্তুকির পরিমাণ বাড়ানোর যে কোনো একটি পথ বেছে নেওয়া ছাড়া উপায় নেই বলেও তারা মনে করছেন।
#আরএ