নিজস্ব প্রতিবেদক | ঢাকা
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
বনানীর ওয়্যারলেস গেইট এলাকায় সরকারি বিপণন সংস্থা টিসিবির (ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ) পণ্য বিতরণে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ডিলার মেহেদী হাসানের বিরুদ্ধে ফ্যামিলি কার্ডধারী সাধারণ মানুষকে পণ্য না দিয়ে কালোবাজারে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ এখন মুখে মুখে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অস্তিত্বহীন দোকানের নামে লাইসেন্স বাগিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে রাজনৈতিক পরিচয় বদলে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ—সবই চলছে দাপটের সাথে।
অস্তিত্বহীন দোকান, তবুও ডিলারশিপ
টিসিবির ডিলারশিপ পাওয়ার অন্যতম শর্ত হলো স্থায়ী মুদি দোকান থাকা। কিন্তু বনানীর ওয়্যারলেস গেইট এলাকায় ডিলার মেহেদীর লাইসেন্সে উল্লিখিত ‘মেহেদী জেনারেল স্টোর’-এর কোনো বাস্তব অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিনে দোকান যাচাই করার কথা থাকলেও, অদৃশ্য কারণে কোনো ভেরিফিকেশন ছাড়াই অবৈধ উপায়ে এই লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। মূলত আবাসিক ভবনের (জ-১৬৮) নিচতলার একটি ফ্ল্যাটকে গুদাম হিসেবে ব্যবহার করে চলছে এই পণ্যের নয়ছয়।
রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট ও ভোলবদল
অনুসন্ধানে জানা যায়, ডিলার মেহেদীর এই দুর্নীতির নেপথ্যে রয়েছে তার শ্বশুর ইদ্রিস আলীর প্রভাব। ইদ্রিস আলী বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির একজন সক্রিয় নেতা ছিলেন। সেই সময় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি জামাইকে টিসিবির লাইসেন্স পাইয়ে দেন। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইদ্রিস আলী বর্তমানে ভোল বদলে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দিয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। রাজনৈতিক লেবাস বদলালেও টিসিবির পণ্য নিয়ে তাদের সিন্ডিকেট বাণিজ্য রয়ে গেছে আগের মতোই।
লাইনে সাধারণ মানুষ, পণ্য যাচ্ছে দোকানে
সরেজমিনে ওয়্যারলেস গেইট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, জ-১৬৮ নম্বর বাড়ির সামনে স্বল্প আয়ের মানুষের দীর্ঘ লাইন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও মিলছে না পণ্য। অথচ বাড়ির ভেতরের দৃশ্য ভিন্ন। সেখানে লাইনের তোয়াক্কা না করে ডিলারের ঘনিষ্ঠ লোকজন বস্তায় ভরে পণ্য নিয়ে যাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পণ্য বহনকারী এই ব্যক্তিরা মূলত আশেপাশের বিভিন্ন মুদি দোকানদার। ফ্যামিলি কার্ডধারীদের বঞ্চিত করে ডিলার মেহেদী এসব পণ্য বেশি দামে খোলা বাজারে বিক্রি করে দিচ্ছেন।
এছাড়া অনেককে দেখা গেছে ১০ থেকে ২০টি কার্ড নিয়ে লাইনের বাইরে থেকেই পণ্য সংগ্রহ করতে। ডিলারের নিজস্ব সিন্ডিকেটের বাইরে সাধারণ কার্ডধারীরা গেলেই শুনতে হচ্ছে, “পণ্য শেষ হয়ে গেছে।”
লাইনে দাঁড়ানো ছকিনা বেগম (৫০) ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন: “সকাল ৭টায় আইসা দাঁড়াইছি। এখন দুপুর বাজে। দেহি বড় বড় বস্তা ভইরা মাল পিছন দিয়া চইলা যাইতাছে। আমাগো চাইলে কয় ‘মাল নাই’। কার্ড থাইকাও যদি মাল না পাই, তবে এই কার্ড দিয়া করমু কী? ডিলার আমাগো লগে বাটপারি করতাছে।”
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন:
“টিসিবির ডিলারশিপ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ভুল তথ্য দেওয়া হলে বা দোকানের অস্তিত্ব না থাকলে সেই লাইসেন্স বাতিল করার স্পষ্ট বিধান রয়েছে। বনানীর এই ডিলারের বিরুদ্ধে প্রাপ্ত অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর। আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখছি। সাধারণ মানুষের হক নিয়ে যারা চিনিমিনি খেলছে, তাদের ডিলারশিপ বাতিলসহ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ভুক্তভোগী এলাকাবাসী অবিলম্বে এই ‘ভুয়া’ ডিলারের লাইসেন্স বাতিল এবং টিসিবির পণ্য বিতরণ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ করার দাবি জানিয়েছেন।