।।মোঃ আব্দুল আউয়াল।।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
আধুনিক জীবন যেন এক দুরন্ত রেলগাড়ি—গন্তব্য নির্ধারিত, বিরাম নেই, দম নেওয়ারও সময় নেই। প্রযুক্তি, পুঁজিবাদ ও বিশ্বায়নের যুগে মানুষের পরিচয় একরকম হয়ে উঠেছে কর্মী-সত্তায়: উৎপাদন করো, উপার্জন করো, দক্ষ হও। প্রতিটি সেকেন্ড আজ হিসেবি; ‘সময়ই অর্থ’—এই অমোঘ তত্ত্ব যেন মানুষের মানসিক অভিধানে গভীরভাবে মুদ্রিত। শহুরে জীবনের নিরন্তর কোলাহল থেকে শুরু করে গ্রামের নীরব সন্ধ্যাতেও এখন কাজের চাপ, প্রতিযোগিতা এবং উৎকণ্ঠা নিত্যসঙ্গী। মানুষ সারাক্ষণ ছুটে চলে; চলে নিজের অস্থিরতার দিকে, ভয় এবং শূন্যতার দিকে।
মানুষের যে মূল্যবোধ একসময় তার সত্তাকে আলাদা মর্যাদা দিত—মানবিকতা, আবেগ, সহমর্মিতা, অনুভব—সেগুলো আজ ধীরে ধীরে আলোহীন হয়ে পড়ছে। কর্মক্ষেত্রে দক্ষ না হলে সে অচিরেই অপ্রয়োজনীয়; সম্পর্কেও যেন ‘লাভ-ক্ষতি’র হিসেব। অনেক বন্ধুর মাঝেও নিঃসঙ্গতা আজ আধুনিক জীবনের সবচেয়ে বড় ছায়া। সংযোগের মাধ্যম যত বেড়েছে, মনের সংযোগ ততই কমেছে। স্ক্রিনের আলোতে মানুষের মুখ উজ্জ্বল হলেও মন রয়েছে অন্ধকারে।
এই বাস্তবতায় প্রশ্ন উঁকি দেয়—মানুষ কি কেবল এক যান্ত্রিক উৎপাদক? জীবনের মানে কি শুধু আয়-ব্যয় আর সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে সাহিত্য ও শিল্প আমাদের কাছে ফিরে আসতে বাধ্য করে। কারণ, জীবনে যতই যুক্তি আর উপযোগিতার অভিব্যক্তি বাড়ুক, এক টুকরো অনুভূতি ছাড়া মানুষ বেঁচে থাকা মানে শুধু শ্বাস নেওয়া—বেঁচে থাকা নয়।
সাহিত্য একজন মানুষকে অন্য মানুষের জীবনের মধ্যে নিয়ে যায়। বই হাতে নিলে আমরা নিজের সীমাবদ্ধ দৃষ্টি থেকে মুক্ত হয়ে অন্যের অশ্রু, হাসি, ভালোবাসা, বেদনা অনুভব করতে শিখি। রবীন্দ্রনাথের গোরা কিংবা বিভূতিভূষণের অপু—এদের গল্প আমাদের শিখিয়েছে, মানুষ কেবল তার কর্মের পরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষ হলো অনুভূতির বিস্তার। কারও চোখের জল যে আরেক মানুষের মনে ঢেউ তোলে, সেটাই মানবতা। আর সেই মানবতার চর্চাই সাহিত্য।
শিল্প ও সাহিত্য মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশেও সমান ভূমিকা রাখে। ভাষার সূক্ষ্মতা আয়ত্ত করার ভেতরেই চিন্তার সূক্ষ্মতা জন্ম নেয়। যুক্তি যখন কল্পনার সঙ্গে মিলে যায়, তখন সৃজনশীলতার জন্ম হয়। আজকের কর্পোরেট জগতে সৃজনশীলতাই হচ্ছে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি—যেটা বই, গান, ছবি, নাটক—এইসব শিল্পচর্চার ভিতর থেকেই সবচেয়ে সহজে গড়ে ওঠে। ইতিহাস বলছে, যারা শিল্প-সংস্কৃতিকে অগ্রাহ্য করেছে, তারা কখনও সত্যিকারের উন্নত হতে পারেনি।
মানুষ এখন মানসিক চাপে প্রায়ই ভেঙে পড়ে। বিজ্ঞান বলছে—সঙ্গীত স্ট্রেস কমায়, মন কোমল করে; ছবি আঁকা বিষণ্নতার অন্ধকার ভেঙে আলো জ্বালায়; কবিতা মনকে শুদ্ধ করে। জীবনের অশান্তিতে একটি সুর, একটি রঙ বা একটি শব্দ আমাদের ভিতরে হারিয়ে যাওয়া স্বস্তিটাকে আবার টেনে আনে। তাই শিল্প কোনো বিলাসিতা নয়; এটি মনুষ্যত্ব ধরে রাখার অস্ত্র।
ডিজিটাল যুগে সমস্যা আরেকটি—তথ্য বাড়ছে, অনুভূতি কমছে। হাজার মানুষের সঙ্গে প্রতিদিন কথা হয়, অথচ মনের কথা বলার মানুষ পাওয়া যায় না। ছবি শেয়ার করা হয়, অথচ গভীর স্মৃতি তৈরি হয় না। তথ্যের ঝড় আমাদের আবেগকে শুষ্ক করে দিচ্ছে। এই শুষ্কতার জল সেচে দেয় শিল্প। সাহিত্য শেখায় থামতে; অনুভব করতে; মনের গোপন কণ্ঠকে শুনতে।
একটি শিশুর বড় হওয়ার গল্পে শিল্পের গুরুত্ব অপরিসীম। পৃথিবীর যত নৈতিক মানুষ, তাদের আবেগের বীজ প্রথম বোনা হয়েছে গল্পের ভেতর দিয়ে। দাদি-নানির মুখের রূপকথা, চিত্রপুস্তকের রঙ, গানের সুর—এসবই শিশুকে মনুষ্যত্ব শেখায়। অথচ আজকের শিশুদের জীবনে স্ক্রিন দখল করে নিয়েছে কল্পনার জায়গা। বাস্তব পৃথিবী থেকে তাদের দূরে সরিয়ে দিচ্ছে ভার্চ্যুয়াল বিনোদন। তাই প্রয়োজন—তাদের হাতে বই তুলে দেওয়া; গল্প শোনানো; গান গাইতে দেওয়া; শিল্পের জগতে ডেকে নেওয়া। কারণ—শিল্পই মানুষকে মানুষ বানায়।
শুধু ব্যক্তি নয়, জাতিসত্তার গঠনে শিল্প-সাহিত্য এক অটল ভিত্তি। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি অধ্যায়ে সাহিত্য ও শিল্প সঙ্গী হয়ে থেকেছে। বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম কিংবা নজরুলের বিদ্রোহী সুরে বাঙালি নিজের মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছে। ভাষার অধিকার রক্ষায় শহীদের রক্ত ঝরেছে; সেই মুহূর্তে কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হয়েছে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’—এ গানের শক্তিই দেখায়, শিল্প কত অসীম ক্ষমতার অধিকারী।
জীবনের যান্ত্রিকতা মানুষকে নিঃশেষ করে দেয়, কিন্তু শিল্প সেই নিঃশেষে নতুন প্রাণসঞ্চার করে। কাজ আমাদের আয় দেয়, কিন্তু আত্মার শান্তি নয়; লক্ষ্য অর্জনের আনন্দ দেয়, কিন্তু জীবনের অর্থ নয়। সাহিত্য-শিল্প মানুষের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকা কষ্ট, ভয় ও শূন্যতার উপর আলতো করে হাত রেখে বলে—“তুমি একা নও।”
মানুষ যদি প্রতিদিন অল্প সময়ও নিজের জন্য রাখে—একটি কবিতা পড়া, একটি গান শোনা, একটি চিত্র দেখা, কিংবা নিছক আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা—তাহলে সেই ক্ষুদ্র সময়টাই তাকে জীবনের সৌন্দর্যের পরশ দেবে। আধুনিক দৌড়ে মানুষ যতই ব্যস্ত হোক, তাকে ফিরতে হবে শিল্পের কোলে; কারণ শিল্পই তার শিকড়, তার আত্মার আশ্রয়।
জীবন কেবল বেঁচে থাকার নাম নয়; সুন্দরভাবে বাঁচাই এর প্রকৃত অর্থ। আর সেই সৌন্দর্যের পথ দেখায় সাহিত্য ও শিল্প। যান্ত্রিকতার বিপরীতে জীবনের সুর খুঁজে পাওয়া—এটাই আমাদের দায়িত্ব, আমাদের অস্তিত্বের চূড়ান্ত আর্তি। পৃথিবী যতই প্রযুক্তি নির্ভর হোক না কেন, মানুষকে মানুষ রাখার শক্তি কেবল শিল্পের কাছেই। তাই শিল্প ও সাহিত্যকে জীবনের বাইরে নয়—জীবনের ভেতরে স্থান দিতে হবে। কারণ যে সমাজ বই পড়ে না, গান শোনে না, নাটক দেখে না—সে সমাজ হয়তো টিকে থাকে, কিন্তু বেঁচে থাকে না।
মানুষ থেকে যন্ত্রে পরিণত হওয়ার এই দৌড়ে থামা জরুরি। প্রয়োজন নিজের ভেতরের দরজা খুলে দেওয়া; সেই দরজার ওপারে যে সুর, যে শব্দ, যে রঙ অপেক্ষা করে আছে—সেটাই আমাদের প্রাণ। তাই বলা যায়—জীবনকে সুন্দর করে, মনকে সজীব রেখে, অনুভূতিকে জাগিয়ে তোলার জন্য শিল্প ও সাহিত্যই আমাদের চিরন্তন সহযাত্রী। তারা শিখিয়ে দেয়—প্রকৃত সাফল্য সেইখানেই, যেখানে মানুষ মানুষ হয়ে থাকে।