দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
মোঃ কামরুল ইসলাম, রাঙামাটি জেলা প্রতিনিধি।
পাহাড়ের বুক চিরে ভোরের সূর্যটা যখন কাপ্তাই হ্রদের শান্ত জলে ঝিলিক দেয়, তখনই শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। রাঙামাটি শহরের প্রাণকেন্দ্র বনরূপা বাজারে বুধবার মানেই অন্যরকম এক কোলাহল। এটি কেবল একটি সাপ্তাহিক হাট নয়; এটি পাহাড়ের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আর বাঙালি জনগোষ্ঠীর মিলনমেলা। সম্প্রীতির এই হাটে পণ্য কেনাবেচার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে মানুষের সাথে মানুষের আত্মিক বন্ধন।প্রতি বুধবার খুব ভোরে দুর্গম পাহাড়ের বিভিন্ন এলাকা থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা, সিএনজি বা পায়ে হেঁটে চাষিরা তাদের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে ছুটে আসেন বনরূপায়। হ্রদের পাড়ে সারি সারি নৌকা ভেড়ে। কেউ নিয়ে আসেন পাহাড়ের জুমের টাটকা সবজি, কেউ বা ঝুড়ি ভর্তি পাহাড়ি ফল। কাকডাকা ভোর থেকে শুরু হওয়া এই কর্মযজ্ঞ চলে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা পর্যন্ত।বনরূপার হাটে চোখ বুলালেই দেখা যায় বৈচিত্র্যের এক বিশাল ক্যানভাস। কী নেই এখানে,পাহাড়ি সবজি ও ফল: পাহাড়ি কলার থোড়, বাঁশকোড়ল, সাবারাং, জুমের আদা, মিষ্টি কুমড়া, আর টকটকে লাল পাহাড়ী মরিচ।
হাতে বোনা কাপড়: চাকমা, মারমা বা ত্রিপুরা নারীদের নিজস্ব তাঁতে বোনা ‘পিনন-হাদি’ কিংবা বাহারি ফতুয়ার দেখা মেলে এখানে।হ্রদের মাছ: কাপ্তাই হ্রদের টাটকা আইড়, বাচা, কাচকি আর চাপিলা মাছের জন্য ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় থাকে সবসময়।
হস্তশিল্প: বাঁশ ও বেতের তৈরি ডালা, কুলা এবং গৃহস্থালির নানা সরঞ্জাম।বনরূপা বাজারের সবচেয়ে সুন্দর দিক হলো এখানকার ব্যবসায়িক পরিবেশ। ক্রেতা-বিক্রেতার মাঝে কে পাহাড়ি আর কে বাঙালি, সেই ভেদাভেদ এখানে গৌণ। পাহাড়ের জুমচাষি নারী যখন হাসিমুখে বাঙালির কাছে তাঁর উৎপাদিত পণ্যের দরদাম করেন, তখন ফুটে ওঠে এক অকৃত্রিম সদ্ভাবের ছবি। দীর্ঘ সময় ধরে চলে আসা এই মেলবন্ধন রাঙামাটির সামাজিক স্থিতিশীলতার এক বড় শক্তি।
”আমরা বংশপরম্পরায় এই বাজারে আসছি। এখানে ব্যবসা শুধু টাকার নয়, বিশ্বাসের। ক্রেতাদের সাথে আমাদের পারিবারিক সম্পর্কের মতো একটা টান তৈরি হয়ে গেছে। হাটে আসা এক জুমচাষি।
বর্তমানে রাঙামাটি ভ্রমণে আসা পর্যটকদের কাছেও ‘বনরূপার হাট’ একটি বড় আকর্ষণ। পাহাড়ের বিচিত্র সংস্কৃতি আর একদম রাসায়নিকমুক্ত টাটকা শাকসবজি কিনতে পর্যটকরা ভিড় জমান এখানে। অনেক বিদেশি পর্যটকেও দেখা যায় পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী পোশাক বা পাহাড়ি ঝাল মুড়ি চেখে দেখতে।
ইট-পাথরের শহরে যখন সম্পর্কের দেয়াল বড় হচ্ছে, তখন বনরূপার এই হাট আমাদের শেখায় কীভাবে ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতি ও ভাষার মানুষ এক হয়ে মিলেমিশে থাকতে পারে। পাহাড়ি-বাঙালির এই মিলনমেলা কেবল রাঙামাটির অর্থনীতিকে সচল রাখছে না, বরং এটি আমাদের জাতীয় ঐক্যের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।