বিলাল মাহিনী
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
(০১) ওহীর ইলম চর্চা তথা জ্ঞান অর্জন করা:
কেননা, ওহির প্রথম নির্দেশে ছিল ‘ইকরা’। সুতরাং ওহীর জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞান শিখতে হবে। আধুনিক জ্ঞান বিজ্ঞানের গোঁড়াপত্তন মুসলমানদের হাতেই হয়েছিল। যেমন, গণিত শাস্ত্র, চিকিৎসা শাস্ত্র, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রসায়ন, বিজ্ঞান-প্রযুক্তিসহ জ্ঞান বিজ্ঞানের এমন কোন শাখা নেই, যেখানে মুসলিম দার্শনিক ও বিজ্ঞানীদের অবদান নেই।
(০২) তাজকিয়া কথা আত্মশুদ্ধি :
ইলম ও আমলের জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে নিজের নফসকে শুদ্ধ করা। একমাত্র ও কেবলমাত্র একজন স্রষ্টা তথা আল্লাহকে নিজের কলবে জায়গা করে দেয়া। সার্বভৌমত্ব শুধুমাত্র একমাত্র আল্লাহর অন্তরে এই কথাটা পরিষ্কার করে গেথে নেওয়া।
মন থেকে অহংকার, হিংসা, লোকদেখানো ইবাদত (রিয়া) ও লোভের মতো আত্মিক রোগ দূর করে আল্লাহর আনুগত্যে মনকে সঁপে দেওয়ার নামই তাজকিয়া।
“যে নিজের আত্মাকে শুদ্ধ করেছে, সে-ই সফল হয়েছে। আর যে নিজের আত্মাকে কলুষিত করেছে, সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।” সূরা আশ-শামস (আয়াত ৯-১০)
(০৩) সুন্নাহর প্রতি মহাব্বত :
সূরা আল ইমরানের ৩১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,
বলুন, ‘তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার (রাসূলুল্লাহর) অনুসরণ করো, আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। আর আল্লাহ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’
সুন্নাহর অনুসরণ হিসেবে বিশ্ব নবীর উপর দরুদ পাঠ, তসবিহ- তাহলিল, পবিত্রতার সাথে চলাফেরা করা, দৈনন্দিন দোয়া এবং সুন্নতি মূয়ামেলাত ও সুন্নতি লেবাস পরিধান করা। বিশ্ব নবীর সা. আদর্শ নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে নেওয়া।
(০৪) সৃষ্টির সেবা :
পশু পাখি থেকে শুরু করে সৃষ্টির প্রতিটা জীবের প্রতি মানুষের রয়েছে দায়িত্ব ও কর্তব্য। এই দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবহেলা না করা । রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমরা জমিনে যারা আছে তাদের প্রতি দয়া করো, তাহলে যিনি আসমানে আছেন (আল্লাহ তাআলা) তিনি তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।” (সুনান আবু দাউদ, তিরমিজি)
(০৫) জিকিরে-ফিকিরে থাকা :
সার্বক্ষণিক জিকির, ইস্তেগফার ও আল্লাহর নূর দিয়ে অন্তর আলোকিত করে রাখা।
“অতএব তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ করব এবং আমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, অকৃতজ্ঞ হয়ো না।”
সূরা আল-বাকারা, (১৫২)।
“এবং তারা যখন কোনো অশ্লীল কাজ করে কিংবা কোনো মন্দ কাজের মাধ্যমে নিজেদের ওপর জুলুম করে, তখন আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে…” সূরা আল-ইমরান, আয়াত (১৩৫)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তেগফার করবে, আল্লাহ তার প্রতিটি সংকট থেকে মুক্তির পথ বের করে দেবেন, প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে স্বস্তি দেবেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেবেন যা সে কল্পনাও করতে পারেনি।”সুনানে আবু দাউদ (১৫১৮)।
(০৬) অর্থসহ কুরআন তেলাওয়াত :
প্রতিদিন কমপক্ষে ছোট একটি সূরা অথবা দশটি আয়াত সহীহ-শুদ্ধ করে তেলাওয়াত করা এবং তার অর্থ বোঝা ।
“নিশ্চয় যারা আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করে, নামাজ কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন এক ব্যবসার আশা করতে পারে যা কখনো ধ্বংস হবে না। যাতে আল্লাহ তাদের পূর্ণ প্রতিদান দেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও বাড়িয়ে দেন। নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল, গুণগ্রাহী।” সূরা আল-ফাত্বির, (আয়াত ২৯-৩০)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমরা কোরআন তেলাওয়াত কর। কারণ কিয়ামতের দিন কোরআন তার পাঠকদের জন্য সুপারিশকারী হিসেবে উপস্থিত হবে।” সহিহ মুসলিম (৮০৪)।
(০৭) সালাতের যত্ন নেওয়া :
সময় মত সালাত আদায় করা এবং ওজুর সাথে বিনয়-নম্রতার সাথে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে হাজির-নাজির জেনে সালাত আদায় করা। বিশেষ করে তাহাজ্জুদ ও নফল সালাতের প্রতি গুরুত্ব আরোপ করা ।
“ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। আর নিশ্চয়ই তা (সালাত) অত্যন্ত কঠিন, কিন্তু খুশু-খুজুকারীদের (বিনীতদের) জন্য নয়।” সূরা আল-বাকারাহ, (আয়াত ৪৫)
জান্নাত ওয়াজিব হওয়ার মাধ্যম: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজু করে, অতঃপর মন ও শরীরকে পুরোপুরি আল্লাহর দিকে রুজু করে (খুশু-খুজুর সাথে) দুই রাকাত সালাত আদায় করে, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়।” (সহিহ মুসলিম)।
(০৮) নফল রোজা :
বিশ্ব নবী সাঃ প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার রোজা রাখতেন। এছাড়াও আশুরা, শবে মেরাজ ও শবেবরাতে রোজা রাখতেন। আল্লাহর অনুগ্রহ পেতে এবং দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণের জন্য মাঝেমধ্যে রোজা রাখাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ।
শাওয়ালের ৬ রোজা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখল, অতঃপর শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা রাখল, সে যেন সারা বছরই রোজা রাখল।” (সহিহ মুসলিম)।
আরাফার দিনের রোজা (৯ জিলহজ): রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আরাফার দিনের রোজার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি যে, তা বিগত এক বছর এবং আগামী এক বছরের গুনাহের কাফফারা (ক্ষমা) হবে।” (সহিহ মুসলিম)।
আশুরার রোজা (১০ মহররম): রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আশুরার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, তা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবে।” (সহিহ মুসলিম)।
আইয়ামে বিজের রোজা (প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ): রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি মাসে এই তিনটি রোজা রাখার জোর তাগিদ দিতেন, যা সারা বছর রোজা রাখার সমতুল্য। (সুনানে নাসায়ি)।
(০৯) দ্বীনি মেহনত বাড়ানো :
দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে দ্বীনি মেহনত বৃদ্ধি করা একান্ত প্রয়োজন। দাওয়াতি জিন্দেগীতে সম্পৃক্ত না হলে নিজের ঈমান এবং আমল ঠিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। মহানবী সা. বলেছেন, আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত জানা থাকলেও অন্যের কাছে তা পৌঁছে দাও।
“আপনি আপনার প্রতিপালকের পথের দিকে হিকমত (প্রজ্ঞা) ও সুন্দর উপদেশের মাধ্যমে আহ্বান করুন এবং তাদের সাথে উত্তম পন্থায় আলোচনা করুন…” — সূরা আন-নাহল, আয়াত: ১২৫
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি কোনো ভালো কাজের পথ দেখায়, সে ঐ কাজ সম্পাদনকারীর সমপরিমাণ সওয়াব লাভ করে।”— [সহিহ মুসলিম]
(১০) পিতা মাতার খেদমত :
বিশ্ব নবী সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম বলেছেন, মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেস্ত এবং পিতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি। সুতরাং পিতা-মাতার খেদমতের মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণ লাভ করা যায় ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সেই ব্যক্তি ধ্বংস হোক! সেই ব্যক্তি ধ্বংস হোক! সেই ব্যক্তি ধ্বংস হোক!” জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! কার কথা বলছেন? তিনি বললেন, “যে ব্যক্তি তার পিতা-মাতার একজন বা উভয়কে বার্ধক্য অবস্থায় পেল, অথচ (তাদের খেদমত করে) জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না।”— সহিহ মুসলিম।
পিতা-মাতার অবাধ্যতা কবিরা গুনাহ: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “আমি কি তোমাদের সবচেয়ে বড় কবিরা গুনাহসমূহ সম্পর্কে জানাব না?” সাহাবিরা বললেন, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন, “আল্লাহর সাথে শরিক করা এবং পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া।”— সহিহ বুখারি
(১১) প্রতিবেশীর অধিকার সুরক্ষা :
প্রতিবেশীর হক আদায় করা ওয়াজিব। এই মহৎ ইবাদতের প্রতি যত্নবান হওয়া। দুস্থ-অসহায় প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া। যথাসম্ভব তাদের সেবা-সশ্রূষা এবং আর্থিক সহযোগিতা করা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “জিবরাইল (আ.) আমাকে প্রতিবেশীর অধিকার সম্পর্কে এতো বেশি অসিয়ত (তাগিদ) করছিলেন যে, আমার মনে হচ্ছিল শীঘ্রই হয়তো প্রতিবেশীকে (উত্তরাধিকার সূত্রে) সম্পদের ওয়ারিশ বানিয়ে দেওয়া হবে।”
— সহিহ বুখারি ও মুসলিম
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “ঐ ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যার অন্যায় ও জুলুম থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না।”— সহিহ মুসলিম
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “সে ব্যক্তি (পূর্ণাঙ্গ) মুমিন নয়, যে নিজে পেট পুরে খায় অথচ তার পাশেই তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।”— শায়বুল ইমান (বায়হাকি), সুনানে আল-কুবরা
বিলাল মাহিনী,
সহকারী অধ্যাপক: গাজীপুর রউফিয়া কামিল মাদ্রাসা,
নির্বাহী সম্পাদক: ভৈরব সংস্কৃতি কেন্দ্র, অভয়নগর, যশোর।