ইসলামে জমজমের পানি বিশেষ মর্যাদাসম্পন্ন। পবিত্র কাবার নিকটবর্তী এই কূপের পানির সঙ্গে জড়িয়ে আছে হজরত ইসমাইল (আ.) ও তাঁর মা হজরত হাজেরা (আ.)-এর ইতিহাস। এ পানির বিশেষ মর্যাদার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলো, মিরাজের রাতে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বক্ষ বিদীর্ণ করে জমজমের পানি দিয়ে তা ধৌত করার ঘটনা, যা সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
Sunnah.com
+1
হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিসে হজরত আবু যর (রা.) জানান, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, মক্কায় অবস্থানকালে তাঁর ঘরের ছাদ খুলে দেওয়া হয়। এরপর ফেরেশতা জিবরীল (আ.) অবতরণ করেন এবং তাঁর বক্ষ বিদীর্ণ করেন। তারপর জমজমের পানি দিয়ে তা ধৌত করেন।
এরপর জিবরীল (আ.) হিকমত ও ঈমানে পরিপূর্ণ একটি স্বর্ণের পাত্র নিয়ে আসেন এবং সেখানকার বিষয়বস্তু নবীজি ﷺ-এর বক্ষে ঢেলে দেন। পরে তাঁর বক্ষ বন্ধ করে তাঁকে হাত ধরে প্রথম আসমানের দিকে নিয়ে যান।
হাদিসের সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস ১৬৩৬; কিতাবুল হজ, জমজমের পানি-সংক্রান্ত অধ্যায়।
Sunnah.com
+1
একই ঘটনার বর্ণনা সহিহ মুসলিমেও রয়েছে। সেখানে বক্ষ বিদীর্ণ করে ধৌত করা এবং হিকমত ও ঈমানে পূর্ণ করার বিবরণ পাওয়া যায়।
Sahih Muslim
+1
ইসলামি ব্যাখ্যায় এই ঘটনাকে রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বিশেষ মর্যাদা, পবিত্রতা এবং মহান দায়িত্বের জন্য আল্লাহর বিশেষ প্রস্তুতির নিদর্শন হিসেবে দেখা হয়। হাদিসে হিকমত ও ঈমান দিয়ে তাঁর বক্ষ পূর্ণ করার কথা এসেছে।
এখানে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়:
তবে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন: হাদিসে ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে, কিন্তু এর প্রতিটি অংশের বিস্তারিত অন্তর্নিহিত কারণ সম্পর্কে আলাদা করে নিশ্চিত বক্তব্য দেওয়া হয়নি। তাই ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাদিসের স্পষ্ট বক্তব্য ও আলেমদের ব্যাখ্যার মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।
হজরত আবু যর (রা.)-এর বর্ণনায় রাসূলুল্লাহ ﷺ জমজমের পানি সম্পর্কে বলেছেন, এটি বরকতময় এবং খাদ্য হিসেবেও উপকারী।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত এই হাদিসে আবু যর (রা.)-এর দীর্ঘ সময় জমজমের পানি পান করে অবস্থান করার ঘটনাও এসেছে।
Islam Question & Answer
+1
এ থেকে বোঝা যায়, জমজমের পানি শুধু সাধারণ পানির মতো নয়; ইসলামে এর বিশেষ বরকত ও মর্যাদা স্বীকৃত।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জমজমের পানি পান করিয়েছিলেন এবং তিনি দাঁড়িয়ে তা পান করেছিলেন।
সূত্র: সহিহ বুখারি, হাদিস ১৬৩৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২০২৭।
Sunnah.com
+1
এ হাদিস থেকে জমজমের পানি পান করার বৈধতা এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর এ-সংক্রান্ত আমলের প্রমাণ পাওয়া যায়।
জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে:
«مَاءُ زَمْزَمَ لِمَا شُرِبَ لَهُ»
অর্থ: “জমজমের পানি যে উদ্দেশ্যে পান করা হয়, তার জন্যই।”
সূত্র: সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস ৩০৬২। মুহাদ্দিসদের অনেকে হাদিসটিকে হাসান বা গ্রহণযোগ্য বলেছেন।
Islam Question & Answer
+1
এ হাদিসের আলোকে জমজমের পানি পান করার সময় আল্লাহর কাছে উপকারী জ্ঞান, সুস্থতা, হালাল রিজিক, ক্ষমা ও কল্যাণের জন্য দোয়া করা যায়। তবে পান করলেই প্রতিটি ইচ্ছা অবশ্যই পূরণ হবে—এমন যান্ত্রিক নিশ্চয়তা হাদিসটি দেয় না। দোয়া কবুলের বিষয়টি আল্লাহর ইচ্ছা ও প্রজ্ঞার অধীন।
সহিহ হাদিসে বক্ষ বিদীর্ণের একাধিক ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। যেমন—
এগুলোকে হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী পৃথক ঘটনার বিবরণ হিসেবে বোঝা হয়। তবে প্রতিটি ঘটনার সময়, উদ্দেশ্য ও পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণে নির্ভরযোগ্য বর্ণনা ও আলেমদের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করা উচিত।
ইসলামি সূত্রে জমজমের পানির মাধ্যমে আরোগ্য কামনার ভিত্তি রয়েছে। তবে দুটি বিষয় আলাদা করে বোঝা প্রয়োজন।
প্রথমত, জমজমের পানির বরকত ও ফজিলত সম্পর্কে ধর্মীয় বিশ্বাস সহিহ হাদিস দ্বারা সমর্থিত। দ্বিতীয়ত, কোনো নির্দিষ্ট রোগে এটি পান করলে নিশ্চিতভাবে রোগ সেরে যাবে—এমন চিকিৎসাগত নিশ্চয়তা দেওয়া ঠিক নয়।
অতএব, কেউ অসুস্থ হলে জমজমের পানি পান করে আল্লাহর কাছে শিফা চাইতে পারেন। একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা গ্রহণ করাও উচিত। ধর্মীয় বিশ্বাস ও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দাবিকে এক করে ফেলা যাবে না।
১. বিসমিল্লাহ বলে পান করুন।
আল্লাহর নাম নিয়ে পান করা ইসলামের সাধারণ আদবের অন্তর্ভুক্ত।
২. ভালো নিয়ত করুন ও দোয়া করুন।
উপকারী জ্ঞান, হালাল রিজিক, ক্ষমা, সুস্থতা ও আখিরাতের কল্যাণ চাইতে পারেন।
৩. তৃপ্তি সহকারে পান করুন।
জমজমের পানি তৃপ্তি সহকারে পান করার কথা আলেমরা মুস্তাহাব আমল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে দাঁড়িয়ে পান করাকে বাধ্যতামূলক মনে করা ঠিক নয়।
Islam Question & Answer
+1
জমজমের পানির মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে নির্ভরযোগ্য হাদিসের মাধ্যমে। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর বক্ষ বিদীর্ণ করে এই পানি দিয়ে ধৌত করার ঘটনা তার বিশেষ ফজিলতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। তবে এ ঘটনা থেকে এমন কোনো দাবি করা উচিত নয়, যা হাদিসে স্পষ্টভাবে নেই।
মুমিনের জন্য উত্তম হলো—জমজমের পানি পান করা, আল্লাহর কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা এবং তাঁর রহমতের ওপর ভরসা রাখা।
আল্লাহ তাআলাই সর্বাধিক জ্ঞাত।