দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়। আর এ জেলার সীমান্তের তেঁতুলিয়া উপজেলা বাংলাদেশের প্রাচীনতম থানাগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি থানা। তেঁতুলিয়া নামকরণের উৎপত্তি কখন, কিভাবে হয়েছে এর কোনো দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে এর নামকরণ নিয়ে রয়েছে নানান শ্রুতি। পাশাপাশি এ উপজেলা এখন পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। আর উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এ উপজেলাকে আরও আধুনিক ও পর্যটকবান্ধব করে তুলতে নেয়া হয়েছে নানান পদক্ষেপ।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
বিভিন্ন তথ্য মতে, কোচবিহারের রাজা যেসব প্রজা খাজনা দিতে পারতো না তাদেরকে এই তেঁতুলিয়ার তেঁতুল গাছের তলায় বেঁধে রাখতেন। অন্য মতে, কোচবিহারের মহারাণী তেঁতুল পছন্দ করায় খাজনা দিতে অক্ষম প্রজাদের কাছ থেকে টাকার পরিবর্তে প্রতীকী খাজনাস্বরূপ তেঁতুলের বীজ গ্রহণ করা হতো। অপরদিকে জনশ্রুতি রয়েছে, ডাকবাংলোর উঁচু টিলার ওপর বাস করতেন একজন বিশিষ্ট বণিক। তার বাবার নাম টিটু হওয়ায় এই জনপদের নামকরণ ‘তেঁতুলিয়া’ হতে পারে বলে প্রচলিত লৌকিক গল্প ও স্থানীয়দের মাধ্যমে জানা যায়। যার ধোঁয়াশা রয়েছে স্থানীয় ও বীর মুক্তিযোদ্ধারেও কাছে।
তেঁতুলিয়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা মজিবর রহমান সময় সংবাদকে বলেন, ‘তেঁতুলিয়ার মহানন্দা নদীর তীরে অবস্থিত ডাকবাংলোতে একজন নাবিক অবস্থান করতো। তার বাবা টিটু থেকে এই তেঁতুলিয়ার নাম করণ হতে পারে।’
অপরদিকে বীর মুক্তিযোদ্ধা বীর প্রতীক আব্দুল মান্নান সময় সংবাদকে বলেন, ‘তেঁতুলিয়ার নামকরণ অনেক আগ থেকেই করা। এর মাঝে অনেকেই অনেক কিছু বলে আসলেও মূলত আমরা জানি তেঁতুলিয়ার অবস্থিত তেঁতুল গাছের কারণে তেঁতুলিয়া নামকরণ।’
‘তেঁতুলিয়া’র সুপ্রাচীন ইতিহাস অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও গৌরবের। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে প্রাচীনকাল থেকে তেঁতুলিয়ার ঐতিহাসিক গুরুত্ব পরিলক্ষিত হয়। স্থল ও নৌপথে তেঁতুলিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল বেশ উন্নত। যোগাযোগ ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে শিল্প বাণিজ্য ও নদী বন্দর হিসেবে ধীরে ধীরে তেঁতুলিয়া হয়ে উঠে সুবিখ্যাত। যার প্রমাণ সরূপ রয়েছে তেঁতুলিয়ার মহানন্দা নদী, ডাকবাংলো, তেঁতুলিয়ার তেঁতুলগাছ, পুরাতন থানাসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা।
এদিকে বর্তমান সময়ে পর্যটন নগর খ্যাত তেঁতুলিয়ার তেঁতুল গাছকে কেন্দ্র করে নামকরণে বিভিন্ন মতাদর্শের কথা জানাচ্ছেন স্থানীয়রা। স্থানীয় আশরাফুল ইসলাম ও জব্বার মিঞা সময় সংবাদকে বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন কথা শুনে এলেও মূলত জানি, এই তেঁতুলিয়ায় একজন মহারাণী থাকতেন। সে সময়ে যারা খাজনা দিতে পারতো না তাদের কাছ থেকে তেঁতুলের বীজ নিতেন। তিনি তেঁতুল খুবই পছন্দ করতেন।’
বর্তমানে নাম করণ ও ঐতিহ্যের পাশাপাশি পর্যটনেও অনেক ভূমিকা রেখেছে তেঁতুলিয়া। এই উপজেলার বিস্তীর্ণ সমতলের চা বাগান, বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত ঘেঁষা ভারতীয় চা বাগানের পাশাপাশি, দুই দেশকে ভাগ করা সীমান্তের কোল ঘেঁষা মহানন্দা নদী ও চারদেশীয় বাংলাবান্ধা স্থলবন্দর দেখতে তেঁতুলিয়ায় পর্যটকদের আনাগোনা কয়েকগুণ বেড়ে যাচ্ছে। একই সঙ্গে অক্টোবরের পর থেকে শীত মৌসুম কাটিয়ে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত খালি চোখে পূর্ব ও পশ্চিম আকাশে দেখা মিলছে ৮ হাজার মিটারের ও ২৬ হাজার ফুটের অধিক উচ্চতার বিশ্বের তৃতীয় সর্বোচ্চ পর্বত চূড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা। যার মনোমুগ্ধকর দৃশ্য সবাইকে আকৃষ্ট করছে।
স্থানীয় ও পর্যটকরা জানান, এরইমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই তেঁতুলিয়া উপজেলা।
এ বিষয়ে তেঁতুলিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোহাগ চন্দ্র সাহা সময় সংবাদকে বলেন, ‘ঐতিহাসিক স্থাপনাসহ নতুন গড়ে ওঠা পর্যটনকেন্দ্রগুলো সংরক্ষণে এরইমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। নতুন করে সাজানো হচ্ছে সব কিছু।’
জানা গেছে, ১৮৯.১২ বর্গ মাইলের তেঁতুলিয়া পঞ্চগড় জেলার সর্ব উত্তরের একটি উপজেলা হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে নামকরণে পর্যটকসহ নতুন প্রজন্মের কাছে সব থেকে বেশি পরিচিত প্রাচীন এই তেঁতুল গাছ। আর এই তেঁতুল গাছটির সঠিক পরিমাপ জানা না থাকলেও স্থানীয়দের ধারণা অনুযায়ী উচ্চতা আনুমানিক ৫০ ফিট এবং বেড় প্রায় ২০০ ফিট। সময় নিউজ