মনির আহমদ আজাদ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ১৪৩৩ বাংলা সনের জন্য লোহাগাড়া উপজেলার আধুনগর ইউনিয়নের হরিণা মৌজায় অবস্থিত ‘ডলু বালুমহাল-৩’ এক বছরের জন্য ইজারা প্রদানের উদ্যোগ নিয়েছে—এমন তথ্য মিলেছে প্রকাশিত দরপত্র বিজ্ঞপ্তি থেকে। কিন্তু সরেজমিন পরিদর্শনে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র, যা জনস্বার্থ ও পরিবেশগত নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র ও বাস্তব পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট খালে বালুর অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। বরং ইতোমধ্যেই খালের তলদেশের মাটির স্তর পর্যন্ত কেটে নেওয়া হয়েছে, ফলে খালের প্রাকৃতিক ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চৌহদ্দী অনুযায়ী বালুমহালটির পশ্চিম সীমানা আরকান সড়ক পর্যন্ত বিস্তৃত, অর্থাৎ ডলু খালের ওপর নির্মিত সেতুর কাছাকাছি এলাকা থেকেই বালু উত্তোলনের কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা।
এখানেই দেখা দিচ্ছে বড় ধরনের অনিয়মের আশঙ্কা। বিদ্যমান বালুমহাল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো সেতুর এক কিলোমিটারের মধ্যে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ প্রস্তাবিত ইজারার অবস্থান সেই নিষিদ্ধ এলাকার মধ্যেই পড়ে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রশ্ন জাগছে—স্থানীয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আদৌ কি সরেজমিনে গিয়ে এলাকা পরিদর্শন করেছেন, নাকি কোনো প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে আঁতাত করে ইজারা প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেখানে খালে বালু নেই, সেখানে ইজারা দিয়ে বালু উত্তোলনের অনুমতি দেওয়া মানেই খালের পাড় কেটে নেওয়ার পথ খুলে দেওয়া। এতে একদিকে যেমন খালের পাড় ভাঙনের ঝুঁকি বাড়বে, অন্যদিকে আশপাশের বসতবাড়ি, সড়ক ও কৃষিজমি মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। পরিবেশগত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এতটাই ভয়াবহ হতে পারে যে, সম্ভাব্য রাজস্ব আয়ের তুলনায় ক্ষতি পূরণে সরকারের ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যেতে পারে।
উল্লেখ্য, ১৪৩২ বাংলা সনে পদুয়া ইউনিয়নের তেওয়ারিখীল এলাকায় ‘চরম্বা জামছড়ি বালুমহাল’ ইজারার ক্ষেত্রেও অনুরূপ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় জামছড়ি খালের সঙ্গে সংযুক্ত টংকাবতী খালের অংশ অন্তর্ভুক্ত করে প্রতিবেদন পাঠানোর ফলে ইজারাদার সারা বছর নির্বিচারে বালু উত্তোলন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, ‘ডলু বালুমহাল-৩’ ইজারা কার্যকর হলে একই ধরনের অনিয়মের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতিতে খাল থেকে বালু উত্তোলন করতে গেলে খালের পাড় কেটে নেওয়া ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
জনস্বার্থে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি জোর দাবি উঠেছে—ইজারা কার্যক্রম স্থগিত রেখে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত পরিচালনা করা হোক। একইসঙ্গে সরেজমিন বাস্তবতা যাচাই না করে কোনো ধরনের ইজারা অনুমোদন না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন সচেতন মহল।
প্রশাসনের দায়িত্বশীল পদক্ষেপই এখন একমাত্র ভরসা—নচেৎ ‘কাগজে বালু, বাস্তবে শূন্য খাল’ এই বাস্তবতা লোহাগাড়ার জন্য এক ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়ের সূচনা হয়ে উঠতে পারে।