প্রতিনিধি,বাঘারপাড়া(যশোর)।।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
বাঘারপাড়ার খানপুর গ্রামের গর্বিত মাতা মিসেস সালেহা আমজাদ খান আর নেই। গতকাল ৪ মে বুধবার বিকাল চারটার দিকে নিজবাড়িতে তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। (ইন্নালিল্লাহে—–রাজেউন)।
সাংবাদিক ও সাহিত্যিক ড. আসাদুজ্জামান খানের মাতা মিসেস সালেহা আমজাদ খান ৯২ বছর বয়সে মিনি স্ট্রোকে মারা যান। মৃত্যুকালে ৫ পুত্র,১ কন্যা জামাতা,পুত্রবধু নাতি নাতনীসহ অসংখ্য গুনগ্রাহী রেখে গেছেন।
১৯৩০ সালের ২৯ জুন যশোর জেলার বাঘারপাড়া উপজেলার পাঠান পাইকপাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবার নাম গহর আলী খান ও মায়ের নাম আয়তুন্নেছা খানম। সে আমলে পরিবারটি ছিল শিক্ষিত। বাড়ির পাশেই বাবার প্রতিষ্ঠিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তার শিক্ষা জীবন শুরু। ১৯৪০ সালে তিনি বৃত্তি নিয়ে মাইনর পাস করেন। মেয়েদের জন্য অত্র এলাকায় কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় তাঁর শিক্ষা জীবনের ইতি ঘটে। এরপর ঘরে বসে তিনি ধর্মীয় শিক্ষা লাভ করেন। তাঁর ছোট চাচা মোবারক আলী খানের কাছে এবং অল্প বয়সে কোরআন শরীফ খতম করেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও মার্জিত স্বভাবের।
মাত্র চৌদ্দ বছর বয়সে ১৯৪৪ সালে তার বিয়ে হয় একই গ্রামের উচ্চ শিক্ষিত ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান আমজাদ আলী খানের সাথে। তৎকালীন বৃটিশ আমলে আমজাদ আলী খানের পরিবারটি ছিল এলাকার মধ্যে সবচেয়ে বিত্তশালী ও রাজনীতিতে শীর্ষ স্থানীয় একটি পরিবার। আমজাদ আলী খানের বড় ভাই রোস্তম আলী খান ছিলেন ইউনিয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান ও শিল্পপতি।
দেশ বিভাগের পর আমজাদ আলী খান সরকারি চাকরিতে যোগ দিলে সালেহা খানম স্বামীর সাথে কিছুদিন ঢাকায বসবাস করেন এবং স্বামীর কাছে ইংরেজি শিক্ষা লাভ করেন। বিভিন্ন ধরণের বই ও পত্র পত্রিকা পড়ার নেশা তার অভ্যাসে পরিণত হয়। যা আজ পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। পঞ্চাশের দশকের শেষ দিকে স্বামীর চাকরির সুবাদে তিনি আবার যশোর ফিরে আসেন এবং পাঠানপাইকপাড়ার পার্শ্ববতর্ী গ্রাম খানপুরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। সালেহা খানম একজন সুগৃহিণী এবং সুমাতা কেবলই নন, তিনি প্রতিবেশী ও আত্মীয় স্বজনের লেখা পড়ার দিকেও নজর রাখতেন।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সালেহা খানম অসামন্য অবদান রাখেন্ তার বাড়ির বিশাল কাছারী ঘরে ছিল ভারতগামী শরনাথর্ীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। মুক্তিযোদ্ধা আর শরনার্থীদের জন্য তার সহযোগীতার হাত ছিল সদা প্রসারিত। মুক্তযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাস তার বাড়িতে তাবু খাটিয়ে শরনার্থীরা থাকতো আর তিনি নেপথ্যে থেকে তাদের আহার যোগাতেন।
স্বচ্ছল পরিবারের বউ হিসাবে তার দয়া দক্ষিণার কথা সর্বজনবিদিত। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি খুবই অতিথি পরায়ন ছিলেন। তার বাড়ি থেকে কেই কিছু পানাহার না করে ফিরে গেছেন এমন নজীর নেই । তিনি একজন যথেষ্ঠ ধর্মপ্রান মানবী। খানপুর খানপাড়া জামে মসজিদের তিনি প্রতিষ্ঠাতা এবং উপদেষ্টা।
কন্যা জায়া জননী এই তিন ক্ষেত্রেই সালেহা খানম সফল এবং সঠিক। তার পিতৃকুল এবং শ্বশুরকুল এখনো অত্র এলাকায় শিক্ষা,রাজনীতি এবং সংস্কৃতিতে অগ্রগামী। সালেহা খানমের ভাইবোনদের মধ্যে রয়েছেন লেখক, সরকারি আমলা, রাজনীতিবিদ এবং সমাজ সেবক। তার একভাই আব্দুল মান্নান খান প্রতিষ্ঠিত একজন লেখক ও পত্রিকার কলাম লেখক।
সালেহা খানম ৫ ছেলে এবং ১ কন্যার জননী। তার চতুর্থ পুত্র ড. আছাদুজ্জামান খাঁন দীর্ঘদিন ধরে দৈনিক মুক্তকণ্ঠ, দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেছেন। বাংলাদেশ এ্যাডুকেশন জানার্লিসট এসোসিয়েশনের নিবার্চিত সভাপতি ছিলেন দীর্ঘদিন। বর্তমানে তিনি প্রস্তাবিত ইউএসবাংলা বিশ্ব্ববিদ্যালয়ের ভাষা সাহিত্য ও সঙস্কৃতি বিভাগের চেয়ারম্যান ও শিক্ষাসংক্রান্ত ওয়েবসাইট স্টাডির প্রধান সম্পাদক। এছাড়াও বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সহযোগী সংগঠন বঙ্গবন্ধু সৈনিকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক তিনি। তার বড় ছেলে আঃ সালাম খাঁন স্থানীয় রাজনীতির সাথে জড়িত ও সমাজ সেবক। মেঝো ছেলে শহীদুল ইসাম খাঁন এবং সেঝে ছেলে আলহাজ্ব জাহাঙ্গীর আলম খাঁন বেসরকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা। ছোট ছেলে রমিজ আমজাদ সরকারী প্রতিষ্ঠানে চাকুরীরত।
এই মহিয়সী নারী সালেহা আমজাদ খাঁন এলাকায় গর্বিত মাতা হিসাবে গুনীজন সম্মাননা পান। ২০১২ সালের ৯,১০ও ১১ই মার্চ খাজুরা এম এন মিত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে “গাইদঘাট কৃষি প্রযুক্তি বাস্তবায়ন কেন্দ্র“ আয়োজিত গ্রামীন জীবনযাত্রা ও কৃষি প্রযুক্তি তথ্য,বীজ মেলার অনুষ্ঠান হয়। এই অনুষ্ঠানে দেশ তথা অত্র অ লের ৩০ জন গুনীজনের সম্মাননা প্রদান করা হয়। ্ওই সময় জীবদ্দশায় গুনীজন সম্মাননার মধ্যে এলাকায় গর্বিত মাতা হিসাবে আলোচিত এই নারী মিসেস সালেহা আমজাদ খান ছিলেন অন্যতম একজন।