মোঃ আব্দুল আউয়াল।
মানুষের বোধ ও চিন্তার বিকাশে পাঠাভ্যাস চিরকালই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার। বই ছিল নাগরিক জাগরণের বাহন, সভ্যতার সোপান। তরুণ প্রজন্মের ব্যক্তিত্ব গঠনে পাঠ যেভাবে ভূমিকা রাখত, তা অন্য কোনো মাধ্যম কখনোই পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর জীবনে সেই পাঠাভ্যাস আজ এক নতুন বাস্তবতায় পৌঁছেছে। আজকের তরুণদের পাঠদৃষ্টিভঙ্গি আর আগের মতো নেই; তাদের হাতে কাগজের বই যতটা থাকে, তার থেকেও বেশি থাকে আলো ঝলমলে স্ক্রিন। তথ্যের গতি যত দ্রুত হয়েছে, পড়ার ধরনও তত বদলে গেছে। গভীর পাঠের জায়গায় দ্রুততর পড়া, দীর্ঘ মনোযোগের জায়গায় ক্ষুদ্র সময়ের দখল; বইয়ের পাতার স্থলে স্মার্টফোন, ট্যাব ও কম্পিউটার—এই নতুন পাঠভূমি তরুণদের জ্ঞান অর্জনের পথ খুলে দিয়েছে, আবার কিছু সংকটও ডেকে এনেছে।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
এক সময় তরুণরা বিকেলে বই নিয়ে বসত পুকুরতীরে, কিংবা পাঠাগারের নীরব টেবিলে। সাহিত্যচর্চা ছিল বন্ধুত্বের বন্ধন, সাংস্কৃতিক উচ্ছ্বাস ছিল বইয়ের পাতায়। বইমেলা ছিল অনুভূতি বিনিময়ের বৃহৎ ক্ষেত্র। সেই সময়ের পাঠক বই কিনে সংগ্রহ করাকে গর্ব মনে করতেন। বইয়ের মলাটের গন্ধ, পৃষ্ঠা উল্টানোর শব্দ—এসব ছিল আনন্দের উৎস। কিন্তু আজকের প্রজন্মের কাছে পড়া মানে শুধু বই নয়; ইন্টারনেট থেকে পাওয়া অসংখ্য তথ্য, ব্লগ, ওয়েব-উপন্যাস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষুদ্র পোস্ট—এসবই এখন পড়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে বইপড়ার প্রচলিত অভ্যাস যেমন চ্যালেঞ্জের মুখে, তেমনই পাঠের ভবিষ্যৎও নতুন রূপে গড়ে উঠছে।
প্রযুক্তি পাঠাভ্যাসে পরিবর্তনের যে বহুমাত্রিক রূপ এনেছে, তার মূল শক্তি হলো—দ্রুততা ও সহজলভ্যতা। যে কোনো বিষয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়া এখন কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার। কাগজের বইয়ের তুলনায় ডিজিটাল বই অনেক দ্রুত পাওয়া যায়, বহন করাও সহজ। এ ছাড়া অডিওবুক তরুণদের আকৃষ্ট করছে, বিশেষ করে যারা চলার পথে সময় কাটাতে চায় কিন্তু বই হাতে নেওয়ার সুযোগ পায় না। অনেকেই আবার ভিডিওভিত্তিক শিক্ষায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। পড়ার বদলে দেখতে চাইছে তারা। এর ফলে লেখার ভাষা ও বর্ণনাশৈলীও বদলে যাচ্ছে। সংক্ষিপ্ততা, সহজতা ও বিনোদন নির্ভরতা বাড়ছে, যা গভীর সাহিত্যচর্চার পথে শঙ্কা সৃষ্টি করছে।
অন্যদিকে পরিবারের ভেতরেও সাহিত্যচর্চার পরিবেশ কমে গেছে। বাবা-মা সন্তানকে বইয়ের দোকানে নেন কম, কিন্তু নতুন ফোন কেনায় উৎসাহী বেশি। স্কুল-কলেজে সাহিত্য শিক্ষা পড়া হয় পরীক্ষার জন্য; বইকে জীবনের সহচর করার শিক্ষা অপ্রতুল। তরুণরা প্রশ্নের উত্তরের জন্য বই নয়, সার্চ ইঞ্জিনে ভরসা রাখে। এই পরিস্থিতিতে তাদের পাঠবোধ হয়ে উঠছে টুকরো টুকরো, ভাসাভাসা। গভীর মনোযোগ, ধৈর্য, বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে—এমন অভিযোগ সচেতন অভিভাবক ও সাহিত্য বিশেষজ্ঞরা প্রায়ই তুলছেন। আবার এও সত্য, তরুণরা এখন আগের তুলনায় বহুমুখী জ্ঞান সম্পর্কে ধারণাশীল হচ্ছে। তাদের দুনিয়া সীমাবদ্ধ নয় কোনো পাঠাগারের চার দেয়ালে; তারা বিশ্বের জয় করে বেড়াচ্ছে আঙুলের স্পর্শে।
তরুণ সমাজের পাঠরুচিতেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে যেখানে কবিতা, রোমান্টিক উপন্যাস, গল্পই বেশি প্রিয় ছিল, এখন সেখানে স্থান করে নিয়েছে সাই-ফাই, থ্রিলার, ডিটেকটিভ গল্প, ব্যক্তিগত উন্নয়নমূলক বই, প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা বিষয়ক গ্রন্থ। অর্থাৎ তারা বইয়ে খুঁজছে নিজের ভবিষ্যৎ, নিজের স্বপ্ন, নিজের সত্ত্বা। সাহিত্য এখন তাদের কাছে শুধুই আবেগ নয়, বরং বাস্তবতার সঙ্গীও বটে। তবু সাহিত্যিকতা কোথাও যেন আগের মতো গভীর আবেশী থাকছে না। গভীর অনুভবের জায়গা দখল করছে দ্রুত উত্তেজনার আকর্ষণ। সময়ের চাপে তরুণরা দীর্ঘ উপন্যাস শেষ করতে আগ্রহ হারায়, কিন্তু গ্রাফিক নভেল বা ওয়েব সিরিজে রূপান্তরিত সাহিত্য গিলে খেতে পারে রাত জেগে। তাদের মনন ও রুচি দ্রুত গতিশীল হয়ে উঠেছে; স্থিরতার জায়গায় চঞ্চলতা বেশি।
সোশ্যাল মিডিয়া পাঠাভ্যাসের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনকারী। এখানে মানুষ পড়ে, লেখেও, সাথে সাথে প্রতিক্রিয়াও দেয়। তরুণরা মন্তব্যে যুক্তি দেখায়, বিতর্ক করে, সাহিত্য নিয়ে অর্জন ভাগাভাগি করে। কিন্তু সমস্যা হলো—ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্যও সহজে ছড়িয়ে পড়ে। মূল্যবোধহীন লেখাও ভাইরাল হয়, অথচ গভীর সাহিত্য ঠাঁই পায় সীমিত পাঠকের কাছে। পাঠ এখন অনেকাংশেই জনপ্রিয়তার প্রতিযোগিতা। লাইক, শেয়ার, ভিউ—এই সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ হয় লেখা ভালো না মন্দ। এর ফলে সাহিত্যজগৎ হয়ে উঠছে বাণিজ্যিক, আর শিল্পচিন্তা হারাচ্ছে তার নৈতিক দৃঢ়তা।
তবে সামাজিক মাধ্যম তরুণদের জন্য সম্ভাবনার দরজাও খুলেছে। নাম না জানা অনেক লেখক এখানে পাঠকের বিশাল একটি প্ল্যাটফর্ম পেয়েছে। বই প্রকাশের খরচ বা প্রকাশকের অনুমতির ওপর নির্ভর না করে নিজের সৃষ্টিশীলতা তুলে ধরতে পারছে তারা। পাঠ এবং লেখার মধ্যকার দূরত্ব কমে গেছে, যা একটি সৃষ্টিশীল সমাজের জন্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
পাঠাগারের গুরুত্ব একসময় যেমন ছিল জাতির মানসিক উন্নতিতে অপরিসীম, আজও তা অক্ষুণ্ণ। কিন্তু আজ অনেক পাঠাগারই প্রযুক্তিহীন, পুরোনো বইয়ের স্তুপে পরিণত হয়ে গেছে। তরুণরা সেখানে যেতে আগ্রহী হয় না। বরং ক্যাফে-লাইব্রেরি ধাঁচের আধুনিক পরিবেশ হলে হয়তো তারা পাঠে আরও আগ্রহী হবে। বইমেলা এখনও তরুণদের স্বপ্ন ও আবেগের স্থান—সেখানে ভিড় বাড়ে, বই কেনার উৎসাহ থাকে—কিন্তু সেই পাঠ কতটা স্থায়ী হয়, সেটাই মূল প্রশ্ন।
শিক্ষা ব্যবস্থার লক্ষ্য হওয়া উচিত পাঠকে পরীক্ষার চাবুক না বানিয়ে আনন্দের উৎস হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। পাঠ্যবইয়ের সঙ্গে সাহিত্য পড়া বাধ্যতামূলক না করে উৎসাহমূলক করলে তরুণদের মধ্যে পাঠের প্রতি ভালোবাসা জাগানো সহজ হবে। পরিবারেও বইকে উপহার হিসেবে দেওয়া উচিত—শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য নয়; মনের খোরাক হিসেবে। রাষ্ট্রীয় নীতিতেও সাহিত্য সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার জন্য প্রযুক্তিসমৃদ্ধ পাঠ প্রকল্প জরুরি।
আজকের পাঠাভ্যাসের সংকটে সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে—এ কথা যেমন সত্য, তেমনই সত্য যে নতুন পাঠ-সংস্কৃতি জন্ম নিচ্ছে। প্রযুক্তি পাঠকে শুধু অন্য মাধ্যম দিয়েছে, নষ্ট করে দেয়নি। বরং বইয়ের গভীরতাকে ডিজিটালের গতির সঙ্গে মিলিয়ে দিতে পারলে পাঠাভ্যাসের ভবিষ্যৎ আরও উজ্জ্বল হতে পারে। তরুণরা যেন প্রযুক্তিতে ডুবে গিয়ে বই ভুলে না যায়—বরং প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বইয়ের জানালা আরও বিস্তৃত করুক, সেটাই কাম্য।
একটি জাতির মেধাশক্তি নির্ভর করে তার তরুণদের নৈতিক শিক্ষা, বৌদ্ধিক চর্চা ও কল্পনাশক্তির ওপর। যে সমাজে তরুণরা বই পড়ে, সেই সমাজ এগোয়। যে সমাজে তরুণরা কেবল স্ক্রল করে, সে সমাজ পিছিয়ে পড়ে। আজ তরুণদের পাঠাভ্যাসের পরিবর্তন আমাদের জন্য সতর্কবার্তা—কিন্তু একই সঙ্গে তা নতুন সম্ভাবনারও দ্বার। তরুণরা যদি প্রযুক্তিকে হাতিয়ার করে নিজেদের বৌদ্ধিক শক্তি বাড়াতে পারে, তবে এই পরিবর্তন হবে এক শুভ-ইতিহাসের সূচনা।
অতএব, পাঠাভ্যাসের এই রূপান্তরকে ভয় নয়—জ্ঞানসমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ নির্মাণের শক্তিতেই রূপান্তরিত করতে হবে। তরুণদের হাতে বই যেমন থাকবে, তেমনি স্মার্টফোনও; কিন্তু দুটোর ব্যবহারে ভারসাম্য আনা গেলে আমরা পাবো এমন একটি প্রজন্ম, যারা ইতিহাস জানবে, বর্তমান বুঝবে এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে দৃঢ় মননে, সৃজনশীল চিন্তায়।