
।।মোঃ আব্দুল আউয়াল ।।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
মানুষের অস্তিত্বভূমি ভাষা, আর ভাষার প্রাণশক্তি শব্দ। পৃথিবীর ইতিহাসে যত রাজনীতি, যত বিপ্লব, সংঘাত, আবার সমঝোতা ও শান্তির পথ তৈরি হয়েছে—সবকিছুতেই শব্দের এক অসীম ক্ষমতা কাজ করেছে। শব্দের রাজনীতি একটি নীরব কিন্তু সর্বশক্তিমান রাজত্ব, যেখানে কোনো বন্দুক নেই, নেই কোনো ট্যাংকের হুমকি; তবুও শব্দের আঘাতে সরকার পড়ে, ক্ষমতা বদলায়, সমাজকাঠামো ভেঙে নতুন সমাজ জন্ম নেয়। কখনো একটি মাত্র শব্দ জনমনে বিদ্রোহের আগুন ছড়ায়, আবার একটি উষ্ণ বাক্য মানুষের হৃদয়ে শান্তির স্নিগ্ধ বৃষ্টি ঝরায়। শব্দ এমনই—অদৃশ্য অথচ পরাক্রমশালী।
শব্দের রাজনীতির ইতিহাস ভাষার বিকাশের ইতিহাসের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মানুষ যখন প্রথম নিজেদের অনুভূতি বা প্রয়োজন প্রকাশ করতে শিখল, তখনই শব্দ ক্ষমতার একটি উপকরণে পরিণত হলো। প্রাচীন গুহার দেয়ালে আঁকা চিত্র হোক বা সংস্কৃত মন্ত্র, আরবি ফতোয়া নামা হোক বা ল্যাটিন চার্টার—শব্দ সর্বদাই রাজনৈতিক শক্তির মূল ভিত্তি। রাজা-বাদশাহরা জানতেন, ক্ষমতা ধরে রাখতে হলে প্রথমেই দখল করতে হবে ভাষার ব্যাখ্যার ক্ষমতা। তাই রাজসভায় ভাষার রূপ নিয়ন্ত্রণ করা হতো, শাসকের কথাই আইন হয়ে যেত। কে কোন শব্দ ব্যবহার করতে পারবে, কী বলা নিষিদ্ধ—এ সবই ছিল ক্ষমতার রাজনীতি।
বাংলার ইতিহাসে শব্দের রাজনীতি দেখা গেছে নানা বাঁকে। একসময় এই ভূখণ্ডে চর্চিত ভাষার উপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে আক্রমণকারী শক্তি। কিন্তু বাংলা ভাষা তার শব্দের শক্তিতে প্রতিরোধ গড়েছে। ১৯৪৮ সালে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা ছিল শব্দের দখলদারিত্বের নির্মম দৃষ্টান্ত। শাসকগোষ্ঠী জানত, ভাষা হারালে জাতি হারাবে ইতিহাস, হারাবে আত্মপরিচয়। তাই শব্দ রক্ষার যুদ্ধে নামল এই দেশের ছাত্রসমাজ, শিক্ষক, সাধারণ মানুষ। “রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই”—এই একটিমাত্র স্লোগানই পরিণত হলো গণঅভ্যুত্থানের ইন্ধনে। শব্দের শক্তিতে রচিত হলো ১৯৫২-র অমর ভাষা আন্দোলন, যার রক্ত-স্বাক্ষরে বাংলা ভাষা পেল রাজকীয় মর্যাদা। শব্দের জয় হলো, অন্যায়ের শব্দনীতি ধসে পড়লো। ভাষার জন্য রক্ত দেওয়ার এই ইতিহাস বিশ্বের আর কোথাও নেই। সেদিনের শব্দই ১৯৭১-এ পরিণত হলো স্বাধীনতার স্লোগানে—“জয় বাংলা”—যা আজও আমাদের অস্তিত্বের মূলমন্ত্র।
শব্দ সবসময় সত্য ও ন্যায়ের নয়। কখনো এটি হয়ে ওঠে বিষ, বিভাজনের তলোয়ার। বিশ শতকের ইউরোপে হিটলারের বক্তৃতা এর সবচেয়ে ভয়ংকর প্রমাণ। “এক জাতি, এক নেতা”—এই ভাষিক প্রোপাগান্ডা কোটি মানুষের মনকে উন্মত্ত করে তুলেছিল। ঘৃণা, বর্ণবাদ ও আগ্রাসনের শব্দসমূহ রাষ্ট্রযন্ত্রের ইন্ধনে পরিণত হয়। নিউরেমবার্গের মাইক ধরে বলা একেকটি বাক্য লক্ষ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছে। সুতরাং স্পষ্ট—শব্দ নিজে ভালো বা মন্দ নয়; রাজনীতি তাকে কোন পথে ব্যবহার করবে সেটিই আসল।
বর্তমান সময়ে শব্দের রাজনীতি আরও ব্যাপক, আরও সূক্ষ্ম এবং আরও বিপজ্জনক। কারণ শব্দের বিস্তার এখন শুধু মুখে বলা বা কাগজে লেখা নয়—এটি এখন ডিজিটাল তরঙ্গে দ্রুততম গতিতে ছুটে যায়। সোশ্যাল মিডিয়া এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে শব্দ সাইবার অস্ত্র। একটি মাত্র পোস্ট, একটি টুইট, একটি বিকৃত শিরোনাম সমাজকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দিতে পারে। মিথ্যা সংবাদ বা গুজবের শব্দরাজনীতি প্রখ্যাত গবেষকরা বলেছেন—“A lie can travel halfway around the world while the truth is still putting on its shoes.” এ যেন আমাদের বর্তমান বাস্তবতার নিত্য উদাহরণ। শব্দের এমন আগ্রাসী শাসনে মানবমস্তিষ্ক হয়ে পড়ছে বন্দি, সত্য ও অসত্যের সীমারেখা মুছে যাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ডিং, এবং মিডিয়ার এজেন্ডাও শব্দের রাজনীতিরই অংশ। কর্পোরেট শক্তি চিত্রের পাশাপাশি শব্দ দিয়ে ভোক্তার মন নিয়ন্ত্রণ করে। “ছাড়”, “অফার”, “লাক্সারি”, “প্রিমিয়াম”—এ ধরনের শব্দ সাধারণ মানুষকে মোহাবিষ্ট করে ফেলে। রাজনীতিতে দেখা যায়—বাংলাদেশে নির্বাচনের সময় শব্দের বাজার জমে ওঠে। “উন্নয়ন”, “পরিবর্তন”, “সমৃদ্ধি”, “গণতন্ত্র”, “ধ্বংস” ইত্যাদি শব্দ ভোট-প্রচারণায় হয়ে ওঠে আবেগ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার। শব্দ এখানে মূল্যবোধের নয়, ভোটের রাজস্ব।
শিক্ষাক্ষেত্রে শব্দের রাজনীতি আরও সূক্ষ্ম। কোন শব্দ বইয়ে থাকবে, কোন ইতিহাস বলা হবে, কোন ঘটনাকে কী নামে অভিহিত করা হবে—এসব সিদ্ধান্তই ভাবনার স্বাধীনতাকে পরিচালিত করে। শিক্ষার্থী শব্দের মাধ্যমেই পৃথিবীকে চিনতে শেখে। তাই শব্দের রাজনীতিতে ভুল বা পক্ষপাতপূর্ণ শিক্ষা একটি প্রজন্মকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করে দিতে পারে। শিশুকে “শিক্ষার্থী” না বলে “প্রোডাক্ট” বলা হলে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে যায়। শব্দের পরিবর্তন শুধু ভাষা নয়, পুরো সমাজের মূল্যবোধে পরিবর্তন ঘটিয়ে দেয়।
ধর্মীয় রাজনীতিতেও শব্দের শক্তি প্রবল। ধর্মগ্রন্থের ব্যাখ্যা, ধর্মীয় নির্দেশের ভাষা—এসবকে কে কীভাবে ব্যাখ্যা করছে তার উপর নির্ভর করে সমাজে শান্তি নেমে আসতেও পারে, আবার সংঘাতের দাবানলও ছড়িয়ে পড়তে পারে। “জিহাদ”, “ফতোয়া”, “অবিশ্বাসী”—এ ধরনের শব্দের ভুল ব্যবহারে বিশ্বজুড়ে হামলা, হত্যা, বিদ্বেষ-চর্চা হয়েছে। অন্যদিকে ধর্মীয় শান্তির ডাক “সালাম”, “দয়া”, “ভ্রাতৃত্ব”—এগুলোও শব্দের রাজনীতিরই অংশ, যা মানুষের বিবেককে কল্যাণমুখী করে তোলে।
সাহিত্য ও কবিতাও শব্দের রাজনীতির অন্যতম ক্ষেত্র। কবি-সাহিত্যিকরা শব্দ দিয়ে মানুষের চেতনায় আলো জ্বালান, আবার শাসক শব্দ দিয়ে তাঁদের মুখ বন্ধ করতে চান। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে রবীন্দ্রনাথ নিষিদ্ধ হয়েছিলেন। কারণ শাসকগোষ্ঠী জানতেন—বিপ্লবী শব্দ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখাতে পারে। কবিগুরু লিখেছিলেন—
“মানুষের বিচার একটি দণ্ডায়মান আদালত নয়,
তা সে মুগ্ধ নয়নে অন্তর্যামী।”
এই এক চরণই প্রকাশ করে দেয় শব্দের রাজনীতি কীভাবে শাসকের আতঙ্কের কারণ হয়। কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কলমও রাষ্ট্রের চোখে অপরাধ ছিল। তাঁর একটি শব্দ—“বিদ্রোহী”—বাংলা জনগণের চেতনার অবস্থান বদলে দিয়েছিল।
আজকের সমাজে শব্দের রাজনীতি নতুন রূপ নিয়েছে—আইন ও নীতি নির্ধারণে শব্দ বাছাইয়ের গোপন চাতুর্য স্পষ্ট। “জাতীয় নিরাপত্তা”, “দেশবিরোধী কার্যকলাপ”, “সাইবার অপরাধ”—এই শব্দগুলো ব্যবহার করে অনেক দেশে বাকস্বাধীনতার উপর সরাসরি আঘাত হানা হয়। সাংবাদিকের প্রশ্নকে বলা হয় “রাষ্ট্রদ্রোহ”, ভিন্নমতকে বলা হয় “ষড়যন্ত্র”, আর গণআন্দোলনকে বলা হয় “নাশকতা”—এভাবেই শব্দ দিয়ে আইনকে ইচ্ছামতো প্রয়োগ করা হয়।
আচরণবিজ্ঞানে শব্দ মস্তিষ্কে প্রভাব ফেলে নিউরনাল প্যাটার্ন তৈরি করে। কোনো ব্যক্তি যদি প্রতিদিন ঘৃণার শব্দ শুনতে থাকে, তার অচেতন মনেও ক্রমশ ঘৃণা তৈরি হয়। তাই রাজনৈতিক বক্তৃতায় শব্দের ব্যবহার বৈজ্ঞানিকভাবে পরিকল্পিত। শব্দ মানুষের আবেগ, ভয়, উত্তেজনা—সবকিছুকে পরিচালিত করে। ফলে রাজনীতিবিদদের জয়ের চাবিকাঠি প্রচারণার শুধু বিষয়বস্তু নয়, সেই বিষয়বস্তুর শব্দ নির্বাচন।
মানুষের প্রাত্যহিক কথাবার্তাতেও শব্দের রাজনীতি লুকিয়ে থাকে। আমরা কাউকে “প্রবাসী” বলি সম্মানের সাথে, কিন্তু “বিদেশি নকশা করা”—বললে সন্দেহ, অবজ্ঞা। আমরা যেভাবে অন্যকে অভিহিত করি, সেটার মাধ্যমে নির্ধারিত হয় তাঁর সামাজিক অবস্থান। উদাহরণস্বরূপ—“গৃহকর্মী” শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে “সহকারি”—তাতে সামাজিক মর্যাদার একটি উন্নয়ন ঘটে। আবার “অলস”, “অশিক্ষিত”, “ছোটলোক”—এ ধরনের শব্দ শ্রেণিভেদ সৃষ্টি করে।
যে সমাজে শব্দ সচেতনভাবে ব্যবহৃত হয়, সেই সমাজ উন্নয়নমুখী। আর যে সমাজে শব্দের অপব্যবহার ঘটে, সেখানে মানবিক মূল্যবোধ ক্ষয়ে যায়। আমরা যখন কাউকে “দেশদ্রোহী” বলি, তখন শুধু একজন মানুষকে নয়, তার মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকেও হত্যা করি। আবার “সহযোগিতা”, “সমঅধিকার”, “নৈতিকতা”—এগুলো শব্দ হলেও একেকটি সমাজবিপ্লবের সূচনাবিন্দু।
বাংলাদেশের সমাজ-রাজনীতিতেও শব্দের রাজনীতি প্রতিনিয়ত ঘটছে। “তরুণ সমাজ”—এ শব্দের মাধ্যমে দায়িত্ব ও ভবিষ্যতের ইঙ্গিত মেশানো হয়। “বেকার”—এই শব্দ আবার একই যুবককে হতাশার প্রতীকে পরিণত করে দেয়। “স্বাধীনতা” শব্দটি আমাদের গর্ব, আর “দুর্নীতি” শব্দটি আমাদের তীব্র ক্ষোভের প্রতীক। শব্দের রাজনীতি এভাবেই জনমনে আবেগের মৌলিক স্থাপনা তৈরি করে।
প্রশ্ন জাগে—এই শব্দের রাজনীতি থেকে উত্তরণের উপায় কী? উত্তরের সারল্য হলো—সচেতনতা। শব্দকে ভেবে ব্যবহার করা, শব্দের পেছনের উদ্দেশ্য অনুধাবন করা, তথ্যের সত্যতা যাচাই করা, এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তৃত করা। আমরা যদি সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে শব্দ ব্যবহার করি, তবে শব্দ হবে মুক্তির হাতিয়ার, রাজনীতির বিষ নয়।
শব্দের রাজত্বে গণতন্ত্র টিকে থাকতে হলে প্রয়োজন মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মান। কারণ একচেটিয়া শব্দনীতি বিশ্বাসের পৃথিবীকে ধ্বংস করে। মনে রাখতে হবে—শব্দের শক্তির সামনে কোনো সেনাবাহিনী টিকতে পারে না। একটি সত্যউচ্চারিত শব্দ ইতিহাস নতুন করে লেখার ক্ষমতা রাখে। যেমন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের কলমের শব্দ আমাদের আত্মপরিচয়ের আলো দিয়েছে, কাজী নজরুলের শব্দ আমাদের শিকল ভাঙার শক্তি দিয়েছে, ভাষাশহীদের উচ্চারিত শব্দ আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্র দিয়েছে।
আজকের বিশ্বে আমরা সবাই শব্দযোদ্ধা। আমরা কিবোর্ডে যে শব্দ লিখি, ফোনে যে ভয়েস পাঠাই, সামাজিক প্ল্যাটফর্মে যে মন্তব্য করি—সেটি সমাজে ইতিবাচক আলো ছড়াতেও পারে, আবার বিভাজনের অন্ধকার নামিয়েও আনতে পারে। শব্দের রাজনীতি তাই প্রত্যেক ব্যক্তির নৈতিক দায়িত্বের বিষয়। একজন সাংবাদিক, একজন শিক্ষক, একজন লেখক কিংবা একজন সাধারণ পাঠক—শব্দের ব্যবহারে সঠিক পথ বেছে নেওয়া তার কর্তব্য।
শব্দের রাজনীতির চরম সার্থকতা তখনই, যখন শব্দ মানুষের মুক্তি, মর্যাদা ও সমতার পক্ষে দাঁড়ায়। শব্দ তখনই রাজকীয়, যখন তা দুর্বলকে শক্তি দেয়, অন্ধকারকে আলো দেয়, মিথ্যাকে ভেদ করে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে। একটি মানবিক শব্দ জীবন বদলে দেয়, একটি ভালোবাসার শব্দ হৃদয়ে নতুন আশার জন্ম দেয়। তাই শব্দের রাজনৈতিক ব্যবহার হবে হিংসা বা শোষণের হাতিয়ার নয়—বরং হবে মানবতার আলোকশিখা।
শেষ পর্যন্ত এটাই সত্য—শব্দ শুধু ভাষা নয়, শব্দই ইতিহাস। শব্দই বিপ্লব। শব্দই সংস্কৃতি, পরিচয়, স্বপ্ন। শব্দের রাজনীতি তাই অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু আমরা চাই—শব্দের রাজনীতিতে থাকুক সত্যের জয়, মানুষের জয়, মানবতার জয়। যেন শব্দের রাজত্ব একদিন সত্যিই সকলের জন্য কল্যাণকর হয়ে ওঠে।