—মোঃ আব্দুল আউয়াল।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
লটারি বনাম ভর্তি পরীক্ষা—এই বিতর্কটি কেবল শিক্ষানীতির একটি সীমিত প্রশ্ন নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ ও ন্যায়বিচারের ধারণার গভীরে থাকা একটি জটিল বিষয়। একটি শিশুর বিদ্যালয়ে ভর্তির প্রক্রিয়া যেমন তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে, তেমনি একটি দেশের নাগরিকদের ভোটাধিকারও নির্ধারণ করে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পথচলা। শিক্ষা ও গণতন্ত্র—এই দুটি ক্ষেত্রই মূলত সুযোগ বণ্টনের প্রশ্নে এসে একবিন্দুতে মিলিত হয়। লটারি ও ভর্তি পরীক্ষার বিতর্ককে যদি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, তবে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
লটারিভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি মূলত একটি সমতাভিত্তিক দর্শনের প্রতিফলন। যখন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটি অসম থাকে, তখন সুযোগকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়াকে অনেক সময় একটি নিরপেক্ষ সমাধান হিসেবে দেখা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর প্রয়োগ রয়েছে। যেমন—যুক্তরাষ্ট্রের কিছু অঙ্গরাজ্যে ‘চার্টার স্কুল’-এ ভর্তির ক্ষেত্রে লটারি ব্যবহৃত হয়, যাতে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীরাও সমান সুযোগ পায়। আবার দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশেও জনপ্রিয় পাবলিক স্কুলগুলোতে অতিরিক্ত আবেদন জমা পড়লে লটারির আশ্রয় নেওয়া হয়।
তবে এই পদ্ধতির একটি মৌলিক সীমাবদ্ধতা হলো—এটি ব্যক্তিগত মেধা ও পরিশ্রমকে যথাযথ মূল্যায়ন করে না। একজন শিক্ষার্থী দীর্ঘকাল প্রস্তুতি নিয়ে কেবল ভাগ্যের কারণে সুযোগ হারাবে, আর অন্য কেউ কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই সুযোগ পাবে—এটি মেধার অবমাননা হিসেবে গণ্য হতে পারে। ফলে প্রশ্ন ওঠে—ন্যায়বিচার কি কেবল সমান সুযোগ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ, নাকি সেই সুযোগের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব?
অন্যদিকে, ভর্তি পরীক্ষা একটি মেধাভিত্তিক কাঠামো তৈরি করে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে এটি দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত একটি পদ্ধতি। এখানে শিক্ষার্থীরা তাদের জ্ঞান ও দক্ষতার মাধ্যমে নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রটি সবার জন্য সমান নয়। শহরের উন্নত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কোচিং সেন্টার ও প্রযুক্তির সুবিধাভোগী শিক্ষার্থীদের তুলনায় প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে থাকে। ফলে সবার জন্য সমান সুযোগ তখন কেবল একটি তাত্ত্বিক ধারণা হয়ে দাঁড়ায়।
এই দ্বন্দ্বকে বোঝার জন্য আমরা গণতান্ত্রিক ভোটব্যবস্থার দিকে তাকাতে পারি। বাংলাদেশ, ভারত কিংবা যুক্তরাষ্ট্র—এই দেশগুলোতে প্রতিটি নাগরিকের একটি করে ভোট রয়েছে। এখানে ‘এক ব্যক্তি, এক ভোট’ নীতিই সমতার প্রতীক। কিন্তু এই সমতা কখনোই লটারির মতো নয়; বরং এটি সচেতন অংশগ্রহণের একটি প্রক্রিয়া, যেখানে নাগরিকের জ্ঞান, মূল্যবোধ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। সরকার স্পষ্টভাবে বলছে—ভোট প্রদানের ক্ষেত্রে কোনো লটারি পদ্ধতি থাকবে না; বরং প্রত্যেক নাগরিক নিজ বিবেচনায় ভোট প্রদান করবে। এই অবস্থানটি একটি মৌলিক নীতিকে সামনে নিয়ে আসে—গণতন্ত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কখনোই ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দেওয়া যায় না। এখানে সচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও অংশগ্রহণই মুখ্য।
এখন প্রশ্ন হলো, যদি রাষ্ট্র ভোটের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে লটারিকে অগ্রহণযোগ্য মনে করে, তবে শিক্ষার ক্ষেত্রেও কি একই যুক্তি প্রযোজ্য নয়? আবার উল্টো দিক থেকে দেখলে—যেখানে সামাজিক বৈষম্য এত প্রবল, সেখানে কি কেবল প্রতিযোগিতার মাধ্যমে প্রকৃত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব?
বিশ্বের কিছু দেশ এই সমস্যার ভিন্ন এক সমাধান খুঁজেছে। যেমন—ফিনল্যান্ডে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় কোনো প্রতিযোগিতামূলক ভর্তি পরীক্ষা নেই। সেখানে প্রতিটি বিদ্যালয়ের মান এমনভাবে উন্নত করা হয়েছে যে, একটি নির্দিষ্ট স্কুলে ভর্তি হওয়া বা না হওয়া শিশুর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয় না। ফলে সেখানে লটারি বা ভর্তি পরীক্ষার বিতর্কটি গুরুত্বহীন।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সমস্যার মূল কারণ ভর্তি পদ্ধতি নয়; বরং শিক্ষার মানের চরম বৈষম্য। কিছু প্রতিষ্ঠান অত্যন্ত উন্নত, আর অনেক প্রতিষ্ঠানই পিছিয়ে আছে। ফলে সবার লক্ষ্য থাকে গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের দিকে। সমাধান তাই একমাত্রিক হতে পারে না। প্রাথমিক স্তরে লটারি পদ্ধতি একটি অন্তর্বর্তী সমাধান হিসেবে কার্যকর হতে পারে, যাতে শিশুদের ওপর অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ কমে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান সমানভাবে উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষায় একটি স্বচ্ছ ও ন্যায্য মেধাভিত্তিক মূল্যায়ন পদ্ধতি গড়ে তোলা জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, ভর্তি পদ্ধতি একটি উপায় মাত্র, উদ্দেশ্য নয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত একটি ন্যায়ভিত্তিক ও দক্ষ সমাজ গঠন করা। সেখানে লটারি ও ভর্তি পরীক্ষা—দুই পদ্ধতিই কার্যকর হতে পারে যদি তা সঠিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করা হয়। যেমন গণতন্ত্রে ভোট কোনো ভাগ্যের খেলা নয় বরং সচেতন সিদ্ধান্তের প্রতিফলন, তেমনি শিক্ষার ক্ষেত্রেও সুযোগ বণ্টন এমন হওয়া উচিত যেখানে সমতা ও মেধা—উভয়ই সমান মর্যাদা পায়। এই ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে বাংলাদেশের জন্য আগামী দিনের বড় চ্যালেঞ্জ।