মনির আহমদ আজাদ।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
সভ্যতার অগ্রযাত্রা যত দ্রুত হচ্ছে, মানুষের নৈতিক ভিত্তি যেন ততটাই দুর্বল হয়ে পড়ছে। চারদিকে প্রযুক্তির বিস্ময়, জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষ, অর্থনৈতিক উন্নয়নের জোয়ার—সবই চোখে পড়ে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষের মন কি সত্যিই উন্নত হয়েছে? সমাজ কি আরও মানবিক হয়েছে? উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থের নয়, ক্ষমতার নয়, বরং নৈতিকতার।
একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে—”ধনের চেয়ে নীতির মূল্য বেশি।” কারণ ধন-সম্পদ মানুষকে সাময়িক স্বাচ্ছন্দ্য দিতে পারে, কিন্তু নৈতিকতা মানুষকে সম্মান, বিশ্বাস ও মর্যাদা এনে দেয়। যে সমাজে নীতি ও বিবেকের চর্চা থাকে, সেখানে আইন কম প্রয়োগ করতে হয়; আর যেখানে নৈতিকতার মৃত্যু ঘটে, সেখানে হাজারো আইনও অপরাধ ঠেকাতে পারে না।
আজ আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে শিক্ষার হার বেড়েছে, কিন্তু চরিত্র গঠনের শিক্ষা কমে গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ অর্জন করা সহজ হয়েছে, কিন্তু একজন সৎ, দায়িত্বশীল ও নীতিবান মানুষ হয়ে ওঠা কঠিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য শুধু চাকরি পাওয়া নয়; বরং একজন আদর্শ মানুষ তৈরি করা। অথচ বর্তমান শিক্ষা ও সামাজিক বাস্তবতায় সেই মূল্যবোধের চর্চা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।
নৈতিকতার অভাবের ভয়াবহ প্রভাব আমরা প্রতিদিনই দেখছি। দুর্নীতি, প্রতারণা, ঘুষ, মাদক, সহিংসতা, পারিবারিক অশান্তি, সামাজিক অবক্ষয়—এসবের শিকড় খুঁজলে দেখা যায়, মূল সমস্যা নৈতিকতার সংকট। মানুষ যখন নিজের বিবেকের কাছে জবাবদিহি করতে ভুলে যায়, তখন অন্যায়কে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে।
একজন শিক্ষক যদি কেবল পাঠদান করেন, কিন্তু শিক্ষার্থীর চরিত্র গঠনে ভূমিকা না রাখেন, তবে সেই শিক্ষা অসম্পূর্ণ। একজন অভিভাবক যদি সন্তানের হাতে দামি মোবাইল তুলে দেন, অথচ নৈতিক শিক্ষা না দেন, তবে ভবিষ্যতে সেই সন্তানের সাফল্যও সমাজের জন্য আশীর্বাদ নাও হতে পারে। কারণ চরিত্রহীন মেধা সমাজের জন্য যেমন বিপজ্জনক, তেমনি নৈতিকতাহীন ক্ষমতা রাষ্ট্রের জন্যও হুমকি।
আজ সমাজে অনেকেই অর্থ ও প্রভাবের দৌড়ে এতটাই ব্যস্ত যে, সত্য, সততা ও মানবিকতাকে অপ্রয়োজনীয় মনে করছেন। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—অর্থ ও ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু নৈতিকতা মানুষের পরিচয়কে যুগের পর যুগ বাঁচিয়ে রাখে। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষদের মহান করেছে তাঁদের সম্পদ নয়, তাঁদের চরিত্র।
পরিবারই একজন মানুষের প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিশুরা বইয়ের আগে বাবা-মায়ের আচরণ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে। তাই সন্তানকে শুধু ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দায়িত্ব শেষ হয় না; তাকে সত্যবাদিতা, সততা, শৃঙ্খলা, সহমর্মিতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয়, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং সমাজের প্রতিটি স্তরে নৈতিক শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।
ধর্মও নৈতিকতার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। ইসলামসহ সব ধর্মই মানুষকে সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারিতা ও মানবকল্যাণের শিক্ষা দেয়। ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি যদি মানুষের অধিকার, সততা ও ন্যায়বিচারের প্রতি দায়িত্ববোধ সৃষ্টি না হয়, তবে সেই ধর্মচর্চার প্রকৃত উদ্দেশ্য পূরণ হয় না।
আমাদের আজ নতুন করে আত্মসমালোচনা করা দরকার। আমরা কি কেবল উন্নত ভবন নির্মাণ করছি, নাকি উন্নত মানুষও গড়ে তুলছি? আমরা কি সন্তানদের কেবল প্রতিযোগিতা শেখাচ্ছি, নাকি ন্যায়-অন্যায়ের পার্থক্যও শেখাচ্ছি? আমরা কি সমাজকে প্রযুক্তিতে এগিয়ে নিচ্ছি, নাকি মানবিকতায় পিছিয়ে দিচ্ছি?
একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার অর্থনীতি নয়, তার নৈতিক ভিত্তি। নৈতিকতা হারিয়ে গেলে সভ্যতা বাহ্যিক চাকচিক্য নিয়ে টিকে থাকতে পারে, কিন্তু ভেতর থেকে ধসে পড়তে বাধ্য।
আজ সময় এসেছে ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্র—সবাইকে নৈতিকতার পুনর্জাগরণে এগিয়ে আসার। কারণ একটি সৎ মানুষ একটি পরিবারকে বদলে দিতে পারে, একটি আদর্শ পরিবার একটি সমাজকে বদলে দিতে পারে, আর একটি নীতিবান সমাজই পারে একটি সমৃদ্ধ ও শান্তিপূর্ণ রাষ্ট্র গড়তে।
নৈতিকতার পুনর্জাগরণই মানবতার পুনর্জাগরণ। মানবতার বিপর্যয় থেকে মুক্তির পথ শুরু হোক আমাদের প্রত্যেকের নিজের বিবেক থেকে।
লেখক-সাংবাদিক,লোহাগাড়া,চট্টগ্রাম।