কুষ্টিয়া প্রতিনিধি।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
তৃতীয় শ্রেণীতে উঠেছিল ছেলেটি। কয়েকদিন স্কুলেও গিয়েছিল। দরিদ্র দিনমজুর পরিবারের সন্তান। হয়ত লেখাপড়া করে একদিন বড়কিছু হবে। বাবা মায়ের দুঃখ ঘোঁচাবে। কিন্ত ভাগ্যের নিদারুন পরিহাস। যার হাতে আজ বই খাতা কলম থাকার কথাছিল। মাত্র ১০ বছর বয়সে সেই হাতে ধরতে হচ্ছে ভ্যানের হাতল।
ভ্যান চালক বাবা চলে গেছেন পরপারে, আর মা ৩ শিশু সন্তানকে ফেলে রেখে চলে গেছেন প্রেমিকের হাতধরে নতুন ঠিকানায়। তাই দুই ভাইবোনের সাথে বৃদ্ধ দাদা দাদির মুখে একমুঠো অন্ন জোগানোর অসমযুেদ্ধ নামতে হয়েছে তৃতীয় শ্রেণী পড়ুয়া জুনায়েদ কে।
অনেকটা সিনেমার মত শুনতে হলেও বাস্তব এ ঘটনাটি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী প্রাগপুর ইউনিয়নের রঘুনাথপুর গ্রামের। এ গ্রামের দিনমজুর মৃত হাবিবুর রহমানের তিন সন্তানের মধ্যে জুনায়েদ দ্বিতীয়।
গেল মার্চে অসুস্থ স্বামী হাবিবুর রহমানের চিকিৎসার জন্য জমানো টাকা নিয়ে তিন শিশুসন্তানকে ফেলে স্থানীয় এক যুবকের সঙ্গে পালিয়ে যায় স্ত্রী রোজিনা খাতুন।
স্ত্রীর বিশ্বাসঘাতকতা এবং চিকিৎসার অভাবে চরম মানসিক ও শারীরিক কষ্টে ভেঙে পড়েন হাবিবুর রহমান। অবশেষে পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন বিনা চিকিৎসায় মারা যান তিনি।
বৃদ্ধ দাদা দাদি সহ ১২ বছর বয়সী বড় ভাই এবং ছোট এক বোন আছে জুনায়েদের। মাত্র দুই বছরের বড় ভাইটিও শারীরিকভাবে অসুস্থ। হাবিবুরের মৃত্যুর পর ভেঙে পড়া সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে মাত্র ১০ বছর বয়সী জুনায়েদের কাঁধে। বাবার রেখে যাওয়া ভ্যান চালিয়ে সংসারের হাল ধরেছে সে। রোদ- বৃষ্টি উপেক্ষা করে সারা দিন ভ্যান চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে পরিবারের খাবার এবং অসুস্থ দাদা-দাদির খরচ। ফলে, স্কুলের পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে গেছে তার।
প্রাগপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র জুনায়েদের নতুন বইগুলো আর ছুঁয়ে দেখা হয়নি।।
জুনায়েদের ভাষ্য, বাবার মৃত্যুর পর এখন আমাদের দেখার কেউ নেই। তাই বাবার রেখে যাওয়া ভ্যান চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে আমাদের খাবার আর দাদা- দাদির খরচ চালাচ্ছি।
জুনায়েদের ভ্যানের যাত্রী হয়েছিলেন স্থানীয় কলেজ শিক্ষক সহঃ অধ্যাপক সামসুল আলম। তিনি বলেন, সবাই বড়দের ভ্যানে ওঠে, এই ছোট বাচ্চাটার ভ্যানে কেউ উঠতে চায় না। ওর কষ্ট দেখে আজ আমি ওর ভ্যানে উঠেছি। এতটুকু বয়সে ও যে দায়িত্ব পালন করছে, তা ভাবলে অবাক হতে হয়।
জুনায়েদের স্কুলে না আসার বিষয়ে জানতে তার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন এর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, জুনায়েদের বাবার মৃত্যু ও মায়ের চলে যাওয়ার পর থেকে সে বিদ্যালয়ে আসছে না। তবে, আমরা ছেলেটির খোঁজখবর রাখছি এবং তাকে আবার শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।
জুনায়েদের ৭০ বছর বয়সী দাদি সপাজান নেছা কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, ‘ঈদের দিন সবাই যখন নতুন জামা পরে ঘুরছে, আমার জুনায়েদ তখন বাবার লাশ কাঁধে নিয়েছে। ওর মা শুধু আমার ছেলের চিকিৎসার টাকা নেয়নি, আমাদের পুরো পরিবারটাকে পথে বসিয়ে দিয়ে গেছে।
এ বিষয়ে প্রাগপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান মুকুল জানান, বিষয়টি সত্যি অমানবিক। তিনি বলেন, আমরা পরিবারটিকে সাহায্য সহযোগীর জন্য চেষ্টা চালাচ্ছি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিঃ অনিন্দ্য গুহ বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ওই পরিবারটির খোঁজখবর নিয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন।