মনির আহমদ আজাদ।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
একটি মানচিত্র, কিছু রক্তাক্ত কাঁটাতার, আর এক দিগন্ত বিস্তৃত দীর্ঘশ্বাস—আজকের ফিলিস্তিনের বাস্তবতাকে হয়তো এই কয়েকটি শব্দে বন্দি করা যায়। কিন্তু যে যন্ত্রণা ফিলিস্তিনের প্রতিটি ঘরে ঘরে শিকড় গেড়েছে, তার গভীরতা কোনো শব্দের মাপে মাপা অসম্ভব।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে মানুষ এসে আশ্রয় নিয়েছিল আরবের এই পুণ্যভূমিতে। ফিলিস্তিনিরা সেদিন বুক চিতিয়ে তাদের স্বাগত জানিয়েছিল, দিয়েছিল মাথার ওপর ছাদ আর বসবাসের অধিকার। কিন্তু সময়ের আবর্তে সেই আশ্রয়দাতাদের কপালই পুড়ল। পর্যায়ক্রমে আশ্রিতরাই হয়ে উঠল অধিপতি। শক্তি আর আধুনিক অস্ত্রের জোরে ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনের বুকের ওপর গড়ে উঠল বসতি, সংকুচিত হতে থাকল আদি বাসিন্দাদের চারণভূমি।
আজ সেই ফিলিস্তিনের আকাশ জুড়ে শুধুই বারুদের গন্ধ। যে মাটির মালিক ছিল আরবরা, আজ সেখানেই তারা পরবাসী, অবরুদ্ধ। চার দশকে একটা প্রজন্ম বড় হয়েছে শুধু বোমার আওয়াজ আর স্বজন হারানোর চিৎকার শুনে। ইসরায়েলি আধুনিক মরণাস্ত্রের সামনে ফিলিস্তিনিদের একমাত্র সম্বল তাদের জন্মভূমির প্রতি ভালোবাসা আর হাতের মুঠোয় থাকা কিছু পাথর।
কল্পনা করুন সেই অবুজ শিশুর কথা, যার চোখের সামনে বুলেটের আঘাতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছে তার জন্মদাতা পিতা আর গর্ভধারিণী মা। যে বয়সে শিশুর হাতে থাকার কথা ছিল রঙিন খাতা আর খেলনা গাড়ি, সেই বয়সে বুকভরা ক্ষোভ আর চোখে টলটলে জল নিয়ে সে কুড়িয়ে নিচ্ছে রাস্তার পাথর। এই পাথর ছুড়ে মারা কোনো রণকৌশল নয়, এটা আসলে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এক চরম হাহাকার। এটা বাঁচার আকুতি, নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার শেষ লড়াই।
কিন্তু পৃথিবীর নির্মম পরিহাস এখানেই। যখন এই মজলুম মানুষগুলো নিজেদের অধিকারের জন্য, একটু বুক ভরে নিঃশ্বাস নেওয়ার জন্য প্রতিবাদ করে, তখন বিশ্বমোড়ল আমেরিকার চোখে তারা হয়ে যায় ‘সন্ত্রাসী’। আক্রান্ত পক্ষকে সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে আর আক্রমণকারীকে ‘আত্মরক্ষা’র অধিকার দিয়ে এক অদ্ভুত নব্য ইতিহাস লেখা হচ্ছে মহাশক্তিধরদের দরবারে।
আমেরিকা ও ইসরায়েলের এই যৌথ শক্তির নির্মমতার শিকার আজ ফিলিস্তিনের হাজারো নারী ও শিশু। হাসপাতালের শয্যা থেকে শুরু করে উদ্বাস্তু শিবিরের তাঁবু—কোথাও তাদের নিরাপত্তা নেই। বোমার আঘাতে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে শতাব্দী প্রাচীন ধর্মীয় উপাসনালয়, মাটির সাথে মিশে গেছে শিশুদের স্বপ্ন বোনার আঙিনা—তাদের স্কুল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
আজকের ফিলিস্তিন মানেই সারি সারি কাফনের কাপড়। আজ ফিলিস্তিন মানেই সন্তানের লাশ কোলে নিয়ে কোনো এক মায়ের বোবা কান্না, যা আকাশ-বাতাসকে ভারী করে তোলে কিন্তু বিশ্ববিবেকের ঘুম ভাঙাতে পারে না। ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া এক একটি শৈশব আর কতকাল এভাবে পৃথিবীর বিবেকহীন নীরবতার সাক্ষী হয়ে থাকবে, সেই প্রশ্ন আজ মানবতার দরবারে।
লেখকঃ সাংবাদিক, লোহাগাড়া, চট্টগ্রাম। ই-মেইল: azad.bd373@gmail.com