মনির আহমদ আজাদ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ভোটের গোপনীয়তা গণতন্ত্রের মৌলিক শর্ত। সাধারণ ভোটার কেন্দ্রে গিয়ে ব্যালটে ভোট দিলে তার ব্যক্তিগত পছন্দ শনাক্ত করার কোনো সুযোগ থাকে না—এটাই প্রচলিত ধারণা ও কাঠামো। কিন্তু পোস্টাল ভোটের ক্ষেত্রে বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই এক ধরনের সংশয় ও আস্থাহীনতা বিরাজ করছে, বিশেষ করে প্রবাসী ভোটার, ডিফেন্স সার্ভিসের সদস্য এবং নির্বাচন গ্রহণ কর্মকর্তা/কর্মচারী ও শিক্ষকদের মধ্যে।
পোস্টাল ভোট ব্যবস্থায় ভোটার পরিচিতি, ভোটের খাম, ঘোষণাপত্র ও প্রাতিষ্ঠানিক নথিপত্রের সমন্বয়ে একটি ট্র্যাকযোগ্য প্রক্রিয়া দৃশ্যমান থাকে—এমন ধারণা থেকে অনেকেই মনে করেন, কোন প্রতীকে কোন কর্মকর্তা/কর্মচারী ভোট দিয়েছেন, তার প্রমাণ নাকি পরোক্ষভাবে সংরক্ষিত থাকে। এই বিশ্বাস থেকে একটি বড় ভয় জন্ম নেয়—ভবিষ্যতে ক্ষমতাসীন সরকার ইচ্ছা করলে এই তথ্য ব্যবহার করে বিরোধী মতাবলম্বীদের চিহ্নিত করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে। বাস্তবে এই আশঙ্কা কতটা যৌক্তিক, সেটাই এখন মূল প্রশ্ন।
আইনি কাঠামোর দৃষ্টিতে পোস্টাল ভোটের গোপনীয়তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের। ভোট গণনা শেষে নথি সংরক্ষণ, সিলগালা ও ধ্বংসের নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে—যাতে কোনো ব্যক্তি বিশেষের ভোট-পছন্দ প্রকাশ না পায়। তত্ত্বগতভাবে কমিশনের হাতে এমন ক্ষমতা বা অনুমতি নেই যে, ভোটার-নির্দিষ্ট পছন্দ প্রকাশ করবে বা ক্ষমতাসীনদের কাছে হস্তান্তর করবে। কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে আস্থার জায়গায়। অতীতের নির্বাচন অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ—এই সব মিলিয়ে অনেক পোস্টাল ভোটারের মনে প্রশ্ন জাগে: সত্যিই কি ভোট গণনা শেষে এসব নথি এমনভাবে ধ্বংস বা সংরক্ষণ করা হয়, যাতে কোনো অপব্যবহারের সুযোগ থাকে না?
এই অনাস্থা থেকেই কেউ কেউ নির্বাচন কমিশনের ওপর ‘বিশ্বাসঘাতকতা হবে না তো?’—এমন সন্দেহ প্রকাশ করছেন। তাদের যুক্তি, যদি কমিশন পুরোপুরি স্বাধীন ও শক্তিশালী হয়, তাহলে পোস্টাল ভোটের গোপনীয়তা নিয়ে ভয় থাকার কথা নয়। অথচ বাস্তবে বহু কর্মকর্তা/কর্মচারী ও শিক্ষক পোস্টাল ভোটে অংশ নিচ্ছেন না—কারণ হিসেবে তারা ভবিষ্যৎ শাস্তি, বদলি, পদাবনতি বা নানামুখী প্রশাসনিক হয়রানির আশঙ্কার কথা বলছেন। এই অনুপস্থিতি নিজেই প্রশ্ন তোলে—ভোটাধিকার প্রয়োগের পথে কেন এমন ভীতি কাজ করছে?
অন্যদিকে, একটি রাজনৈতিক ব্যাখ্যাও আলোচনায় আসে। কেউ কেউ মনে করেন, পোস্টাল ভোট নিয়ে ভয় ছড়ানো বা বিভ্রান্তি তৈরি করা আসলে একটি কৌশল—যাতে নির্দিষ্ট শ্রেণির ভোটাররা ভোট থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। সমালোচকদের ভাষায়, ক্ষমতাসীন দলের সুবিধা নিশ্চিত করতে বা বিরোধী ভোট কমাতে এমন ‘কুবুদ্ধি’ বা পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো হতে পারে। তবে এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণ-নির্ভর না হলে তা রাজনৈতিক বয়ান হিসেবেই থেকে যায়।
সব মিলিয়ে পোস্টাল ভোটের বিতর্ক মূলত দুই স্তরে—আইনি বাস্তবতা ও জনমানসের আস্থা। আইন বলে, ভোট গোপন; বাস্তবতা বলে, আস্থার ঘাটতি। এই ফাঁক পূরণ করতে নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব আরও স্বচ্ছতা দেখানো—পোস্টাল ভোট কীভাবে গ্রহণ, গণনা, সংরক্ষণ ও ধ্বংস করা হয়, তা প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করা এবং নিরপেক্ষ তদারকি নিশ্চিত করা। আস্থা ফিরলে ভয় কমবে, আর ভয় কমলেই ভোটাধিকার পূর্ণতা পাবে।
গণতন্ত্র কেবল নিয়মে নয়, বিশ্বাসেও টিকে থাকে। পোস্টাল ভোট নিয়ে যে সংশয়—তা দূর না হলে ভোটারদের অংশগ্রহণ সংকুচিত হবে, আর সেটাই হবে গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় ক্ষতি।