কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার একটি গ্রামে লোকজ ঐতিহ্য আর ধর্মীয় রীতি মেনে জাঁকজমকপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে বট ও পাকুড় গাছের বিয়ে। সোমবার সন্ধ্যায় শত শত মানুষের উপস্থিতিতে এই ব্যতিক্রমী বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। মূলত ধর্মীয় বিশ্বাস এবং পরিবেশ রক্ষার তাগিদ থেকেই গ্রামবাসী এই আয়োজনে শামিল হয়েছেন।
উপজেলার নাজিম খাঁন ইউনিয়নের সোনালুর কুঠি গ্রামের বাসিন্দা কিরিত কান্তি রায়ের বাড়িতে এই বিয়ের আয়োজন করা হয়। যেখানে দুই গাছের মিলন দেখতে ভিড় জমান প্রতিবেশীসহ দূর-দূরান্ত থেকে আসা উৎসুক মানুষ।
বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় কোনো কমতি ছিল না। পাকুড় গাছকে বরের সাজে ধুতি ও পাঞ্জাবি পরানো হয়, আর বট গাছটিকে কনের সাজে পরানো হয় শাড়ি। এমনকি উভয় গাছে মানুষের আদলে মুখোশও ব্যবহার করা হয়। বিয়ের জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয় ছাদনাতলা, যা সাজানো হয়েছিল কলাগাছ, শামিয়ানা, ইট এবং টাইলস দিয়ে।
বিয়ের আগে গ্রামের নারীরা হলুদ শাড়ি পরে রীতিমতো গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান পালন করেন। সানাই আর বাদ্য-বাজনার তালে নদী থেকে জল ভরে আনা হয়। বিয়েতে অংশ নেন অর্ধশতাধিক বরযাত্রী, যাদের জন্য ছিল পোলাও, পায়েস ও নানা পদের নিরামিষ খাবারের ব্যবস্থা।
সন্ধ্যায় শাস্ত্রীয় মন্ত্র পড়ে বিয়ের মূল পর্ব সম্পন্ন করেন পুরোহিত কমল চক্রবর্তী। গ্রামের বাসিন্দা গৌতম কুমার কনের (পাকুড়) বাবা হিসেবে কন্যা সম্প্রদান করেন। অন্যদিকে বরের (বট) বাবার দায়িত্ব পালন করেন গৃহকর্তা কিরিত কান্তি রায়।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, বট ও পাকুড় গাছ একসঙ্গে থাকলে তাদের বিয়ে দিতে হয়, যাতে গৃহস্থের কোনো অমঙ্গল না হয়। তবে এই আয়োজনের পেছনে বৃক্ষ রক্ষার বিষয়টিও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
বাড়ির মালিক কিরিত কান্তি রায় জানান, শাস্ত্রমতে তিনি আসলে ‘লক্ষ্মী-নারায়ণ’ পূজা করেছেন। তার মতে, বটকে নারায়ণ এবং পাকুড়কে লক্ষ্মী হিসেবে বিবেচনা করে এই পূজা ও বিয়ের আয়োজন। স্থানীয় বাসিন্দা বিজন চন্দ্র ও ইন্দ্রজিত রায় বলেন, “আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি এই গাছ দুটি কখনোই কাটা হবে না। আগামী প্রজন্মকেও আমরা বলে যাব যেন এই বৃক্ষ রক্ষা করা হয়।”
গ্রামবাসীদের মতে, বর্তমানে অনেক পুরোনো গাছ বিলীন হয়ে যাচ্ছে। এই ধরনের উৎসবের মাধ্যমে একদিকে যেমন ঐতিহ্য টিকে থাকে, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী গাছগুলোকেও দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হয়।