মোঃ আব্দুল আউয়াল
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
ভোরের আগে যে আলোটি আসে
তার রঙ একটু অন্যরকম—
মনে হয় মাটির গভীরে
কেউ গোপনে আগুন রেখে গেছে।
সেই ভোরে দেখি
বাঁশঝাড়ের পাশে,
শুকনো পাতার নিচে
একটা শব্দ ধীরে ধীরে মাথা তুলছে।
কেউ তাকে বপন করেনি,
কোনো কৃষক তার চারপাশে বেড়া দেয়নি,
তবু সে উঠছে—
মাটির ভেতরকার অস্থিরতার মতো।
আমি হাত বাড়িয়ে ছুঁতেই বুঝলাম
ওটা কোনো গাছ নয়,
ওটা এক ধরনের উচ্চারণ—
যার শিকড় বহু মানুষের বুকের ভেতর।
গ্রামের পথ দিয়ে তখন
মানুষ হেঁটে যাচ্ছে স্বাভাবিক দিনের মতো,
কিন্তু বাতাসে অদ্ভুত এক সঞ্চার—
যেন প্রতিটি পদচিহ্ন
একটি অদেখা মঞ্চের দিকে যাচ্ছে।
হঠাৎ মনে হলো
মাটি আসলে কখনো নীরব থাকে না;
সে কেবল সময়ের অপেক্ষা করে
কোনো একজনের কণ্ঠ হয়ে ওঠার জন্য।
সেই কণ্ঠের আগে
দীর্ঘ প্রস্তুতি থাকে—
ধানক্ষেতে ঝড়ের শব্দ,
নদীর জলে গোপন অদৃশ্য জোয়ার,
মায়ের নিঃশ্বাসে জমে থাকা উদ্বেগ।
তারপর একদিন
মার্চ এসে দাঁড়ায় দোরগোড়ায়।
মার্চ মানে শুধু ক্যালেন্ডারের পাতা নয়—
মার্চ মানে
একটি জমে থাকা যুগের দরজা খোলা।
সেদিন শহরের আকাশে
পাখিরা একটু নিচু দিয়ে উড়ছিল,
যেন তারা শুনতে চায়
মানুষের ভেতর জন্ম নিতে থাকা শব্দ।
একটি মাঠে
হাজারো মুখের ভিড়ের মাঝখানে
একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন।
তিনি হাত তুলতেই
দেখা গেল—
মানুষেরা আর আলাদা আলাদা নয়,
সবাই যেন একটি বিশাল নদী।
তার কণ্ঠ যখন বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল
মনে হলো
বাংলার মাটি প্রথমবার নিজের নাম উচ্চারণ করল।
বৃক্ষেরা স্থির হয়ে শুনল,
ঘাসের ডগা কেঁপে উঠল,
দূরের নদী একটু থেমে গেল।
মার্চ তখন আর মাস নয়—
মার্চ তখন এক বিশাল প্রতিধ্বনি।
যে প্রতিধ্বনি
গ্রামের উঠোন থেকে শহরের ছাদে,
চায়ের দোকান থেকে নৌকার মাঝি পর্যন্ত
একই স্রোতে ছুটে গেল।
আমি আবার মাটিতে কান রাখি—
শুনি
মাটির নিচে অসংখ্য হৃদস্পন্দন।
সেখানে কেউ বলছে স্বাধীনতা,
কেউ বলছে অধিকার,
কেউ শুধু নিঃশ্বাসের মতো উচ্চারণ করছে—
আমরা আছি।
আর সেই সব শব্দের কেন্দ্রে
দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ—
যেন তিনি নিজেই
একটি সময়ের দরজা।
তার চোখে ছিল ভবিষ্যতের নকশা,
তার কণ্ঠে ছিল
একটি জাতির প্রথম পূর্ণ শ্বাস।
মার্চ তখন
নদীর স্রোতের মতো সামনে এগোচ্ছে,
মানুষেরা তার ভিতর হাঁটছে
নিজেদের নতুন নামে ডাকতে ডাকতে।
আর আমি ভাবি—
ইতিহাস কখনো হঠাৎ জন্মায় না।
সে আগে
মাটির নিচে দীর্ঘদিন ঘুমায়,
মানুষের ভেতর জমে থাকে,
তারপর কোনো এক সকালে
একজন মানুষের কণ্ঠ হয়ে জেগে ওঠে।
আজও কখনো কখনো
ভোরের দিকে উঠোনে দাঁড়ালে
মনে হয়—
মাটির নিচে এখনো সেই শব্দ ঘুমিয়ে আছে।
আর দূরে কোথাও
মার্চ ধীরে ধীরে হাঁটছে
একজন মানুষের পদচিহ্ন অনুসরণ করে।
০৭/০৩/২০২৬ইং