ডেস্ক নিউজ।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোতে ক্রমেই নাজুক পরিস্থিতির ইঙ্গিত মিলছে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশে নেমে এসেছে, রফতানি টানা আট মাস ধরে নেতিবাচক রয়েছে, আর একই সময়ে সরকারের ব্যাংক ঋণ দ্রুত বাড়তে থাকায় বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে সরকারের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৩৪ হাজার ৩৬১ কোটি টাকা, যা ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৬৩ হাজার ১৯৩ কোটি টাকায়। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ বেড়েছে ১ লাখ ২৮ হাজার ৮৩২ কোটি টাকা বা প্রায় ২৯.৬৬ শতাংশ।
অন্যদিকে, একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। ব্যাংক খাতে আমানত বৃদ্ধি প্রায় ১০ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকায় নতুন বিনিয়োগের সুযোগ কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরকার নিয়মিত ট্রেজারি বিল ও বন্ডের মাধ্যমে ঋণ সংগ্রহ করছে। ২৯ মার্চ ট্রেজারি বিলের মাধ্যমে ৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে, যেখানে বিভিন্ন মেয়াদে সুদহার ৯.৭৮ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ছিল। এছাড়া ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে আরও ২ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। অর্থ সংকটের মধ্যে ১ এপ্রিল ৯১ দিন মেয়াদি বিলের বিশেষ নিলামে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি সংকটের কারণে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও সার খাতে ভর্তুকির চাপ বাড়ছে, যা নতুন বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সরকারের ব্যয় কমানো হয়নি, বরং সামাজিক সুরক্ষা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি ও নতুন প্রকল্প গ্রহণ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্ব আহরণ লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী না হওয়ায় ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।
অর্থনীতির অন্যান্য সূচকের মধ্যে মূল্যস্ফীতি এখনও উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। সর্বশেষ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯.১৩ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৪৯ শতাংশ। তবে রেমিট্যান্স প্রবাহ প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়ে একমাত্র ইতিবাচক প্রবণতা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান মনে করেন, সরকারি ঋণ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত না হওয়ায় এটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না। অন্যদিকে, উচ্চ সুদের কারণে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণ নেওয়া কঠিন হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজ-এর সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, সরকার ব্যাংক খাতের বড় অংশের আমানত ব্যবহার করছে, ফলে বেসরকারি খাত ঋণ বঞ্চিত হচ্ছে এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
অর্থ বিভাগের তথ্যানুসারে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকারের ঋণ গ্রহণের লক্ষ্য ২ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকা। বর্তমানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৩.৫ লাখ কোটি টাকা।
এ বিষয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানো, কর ফাঁকি রোধ এবং প্রকল্পের কার্যকারিতা যাচাইয়ের মাধ্যমে অর্থ সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলছেন, বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সরকারি ঋণ ও সুদের চাপ আরও বাড়বে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।