মনির আহমদ আজাদ।।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
সমাজে যখন কোনো মানুষ অন্যায়ের শিকার হন, তখন তাঁর শেষ ভরসার জায়গা হয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। জমি দখল, ঋণের টাকা আত্মসাৎ, চাঁদাবাজি, পারিবারিক নির্যাতন, অসামাজিক কর্মকাণ্ড, প্রতারণা কিংবা ভয়ভীতির কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বেড়ানোর মতো অসংখ্য সমস্যার সমাধানের আশায় মানুষ থানার দ্বারস্থ হয়। কারণ রাষ্ট্রের আইনি সুরক্ষা পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার সবারই রয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতার সঙ্গে প্রত্যাশার এই ব্যবধানই আজ সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয়। অনেক ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার পেলেও, অনেকে অভিযোগ করেন যে তাঁদের অভিযোগ গুরুত্ব পায় না, তাঁরা হয়রানি, অবহেলা কিংবা অপমানের শিকার হন। এতে বিচারপ্রার্থীদের মধ্যে হতাশা জন্ম নেয় এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে সমাজের দরিদ্র, প্রভাবহীন ও অসহায় মানুষের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ—অর্থ, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সুপারিশ অনেক সময় বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। যদিও আইন সবার জন্য সমান হওয়ার কথা, বাস্তবে সেই সমতা নিশ্চিত করা সব সময় সম্ভব হচ্ছে না—এমন অভিযোগ সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে প্রায়ই উঠে আসে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, কিছু ক্ষেত্রে নারী ভুক্তভোগীদের হয়রানি বা অনৈতিক প্রস্তাবের অভিযোগও জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করে। যদি কোনো নারী আইনি সহায়তা চাইতে গিয়ে দায়িত্বশীল কারও কাছ থেকে অনৈতিক আচরণ, যৌন হয়রানি বা ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার হন, তবে তা শুধু ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; এটি পুরো বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এমন অভিযোগের অবশ্যই নিরপেক্ষ, দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও যথাযথভাবে যাচাই হওয়া জরুরি।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে একজন নারী, শিশু, বৃদ্ধ কিংবা যেকোনো সাধারণ নাগরিক থানায় প্রবেশ করার সময় নিরাপত্তা ও সম্মানের অনুভূতি নিয়ে যেতে পারেন। অভিযোগকারী যেন কখনোই ভুক্তভোগী থেকে দ্বিতীয়বার ভুক্তভোগীতে পরিণত না হন।
বর্তমান সময়ে সমাজের প্রায় প্রতিটি খাতেই নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হচ্ছে। দায়িত্বশীলতার অভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং জবাবদিহিতার সংকট অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। তবে এটিও সত্য যে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে বহু সৎ, দক্ষ ও মানবিক কর্মকর্তা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের অবদানকে মূল্যায়ন করার পাশাপাশি যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করেন, তাঁদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণই হতে পারে প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ন্যায়বিচার কোনো বিশেষ শ্রেণির জন্য নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার। একটি সভ্য রাষ্ট্রে আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতিই হতে হবে বাস্তবতার ভিত্তি। মানুষ যেন থানাকে ভয় নয়, আস্থার প্রতীক হিসেবে দেখে—সেই পরিবেশ গড়ে তোলাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।