ঢাকঢোল-বাঁশির সুরে মুখর মেলা, পূজারিদের আকৃষ্ট করতে বায়নার অপেক্ষায় বাদকেরা
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
রকি হাসান,
স্টাফ রিপোর্টার
নীল আকাশে মেঘের ভেলা, নদীর ধারে বাতাসে দোল খাচ্ছে কাশফুল। শরতের স্নিগ্ধতা আর শিউলি ফুলের সুবাসে প্রকৃতি সেজেছে অপরূপ সাজে। এমনই এক আবহে ঢাকের গম্ভীর আওয়াজ জানান দিচ্ছে শারদীয় দুর্গাপূজার আগমনী বার্তা। ঢাকঢোল আর বাঁশির সুরে মুখর হয়ে উঠেছে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পৌর এলাকার পুরাতন বাজার। দুর্গাপূজা উপলক্ষে এখানে বসেছে প্রায় দুইশ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের মেলা। তবে এই মেলায় ঢাকঢোল কিংবা বাঁশি কেনাবেচা হয় না; বরং বাদকেরা নিজেদের বাজনার ছন্দে পূজারিদের আকৃষ্ট করেন, আর পছন্দের দলকে বায়না করে নিয়ে যান পূজা উদ্যাপনকারীরা।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) শুরু হওয়া দুই দিনের এই মেলা চলবে শুক্রবার রাত পর্যন্ত। মেলায় দলবেঁধে ঢাকঢোল ও বাঁশি বাজিয়ে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরছেন বাদকেরা। শত শত ঢাকের আওয়াজ আর নানা ধরনের বাঁশির সুরে মুখর হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। দুর্গাপূজা শুরুর ঠিক আগে প্রতিবছরই এমন প্রাণবন্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয় কটিয়াদীর পুরাতন বাজারে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য বহনকারী এই মেলার বিশেষত্ব হলো, এখানে বাদ্যযন্ত্রের বেচাকেনা নয়, চলে বাদক দল বাছাই ও বায়নার দর-কষাকষি। দূরদূরান্ত থেকে আসা পূজারিরা নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী ঢাকির দল নির্বাচন করেন। তাঁদের আকৃষ্ট করতে ঢাকিরা বিভিন্ন ছন্দে ঢাক বাজান। কেউ বাজনার তালে নাচেন, কেউ আবার নানা অঙ্গভঙ্গিতে তুলে ধরেন নিজেদের পারদর্শিতা।
বাজনা পছন্দ হলে শুরু হয় বায়নার দর-কষাকষি। দলের সদস্যসংখ্যা, বাদ্যযন্ত্রের ধরন এবং পরিবেশনার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয় বায়নার অর্থ। উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হলে চুক্তি চূড়ান্ত হয়। এভাবেই মেলা থেকে পছন্দের বাদক দল বায়না করে নিয়ে যান বিভিন্ন এলাকার পূজারিরা।
প্রযুক্তির প্রভাবে কমছে ঢাকির সংখ্যা
একসময় কয়েকশ থেকে এক হাজার পর্যন্ত ঢাকি ও বাদক দল এই মেলায় সমবেত হতেন বলে স্থানীয়দের ভাষ্য। তবে সময়ের পরিবর্তন ও প্রযুক্তির প্রভাবে ঐতিহ্যবাহী এই মেলার জৌলুশ কিছুটা কমেছে। বর্তমানে মুঠোফোনের মাধ্যমেই অনেক পূজা কমিটি আগেভাগে বাদক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে বায়না চূড়ান্ত করে ফেলছে। ফলে আগে থেকে চুক্তিবদ্ধ হতে না পারা ঢাকিরাই মূলত মেলায় আসছেন।
স্থানীয়দের ধারণা, বর্তমানে মেলায় প্রায় ৫০ থেকে ১০০টি বাদক দল সমবেত হয়। এ ছাড়া আধুনিক সাউন্ড সিস্টেমের ব্যবহার বাড়ায় ঐতিহ্যবাহী ঢাকঢোলের কদরও আগের তুলনায় কমছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তবে অনেক পূজারির মতে, ঢাকের কাঠির ছন্দ আর বাঁশির সুর ছাড়া দুর্গাপূজার আনন্দ যেন পূর্ণতা পায় না। তাঁদের কাছে ঢাকঢোল শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়, বরং পূজার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
একসময় পাশের আড়িয়াল খাঁ নদ দিয়ে নৌকায় করে ঢাকার নবাবগঞ্জ, বিক্রমপুর, মুন্সীগঞ্জ, দোহার ও কেরানীগঞ্জ থেকে বহু ঢাকি এই মেলায় আসতেন। সময়ের পরিবর্তনে তাঁদের যাতায়াতের ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। এখন অনেকেই সড়কপথে মেলায় আসেন। ময়মনসিংহ অঞ্চলের পাশাপাশি গাজীপুর, হবিগঞ্জ ও হাওরাঞ্চলের বিভিন্ন পূজা কমিটির লোকজনও এখানে এসে পছন্দের বাদক দল বায়না করে নিয়ে যান।
জনশ্রুতিতে মেলার সূচনার ইতিহাস
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার চারিপাড়া গ্রামে স্থানীয় সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায় তাঁর রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। পূজার জন্য সেরা ঢাকিদের সমবেত করতে তিনি বিক্রমপুর পরগনাসহ বিভিন্ন এলাকায় আমন্ত্রণবার্তা পাঠান। তখন নৌপথে অসংখ্য ঢাকি কটিয়াদীতে এসে সমবেত হন। সেই আয়োজন থেকেই ঢাকের হাটের সূচনা বলে প্রচলিত রয়েছে।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই ঐতিহ্য টিকে আছে। সময়ের সঙ্গে মেলার আয়োজন ও অংশগ্রহণের ধরনে পরিবর্তন এলেও দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে ঢাকিদের এই সমাবেশ এখনো স্থানীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে রয়েছে।
সুযোগ-সুবিধার অভাবে হতাশ ঢাকিরা
মেলায় আসা ঢাকিদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। আট বছর আগে সাবেক এক সংসদ সদস্য ঢাকিদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আট লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছিলেন বলে জানান তাঁরা। বিভিন্ন সময় আরও সহায়তা দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়ে গেছে।
ঢাকিদের অভিযোগ, তাঁদের বিশ্রামের জন্য নির্মিত বিশ্রামাগারটি সংশ্লিষ্টদের উদাসীনতা ও যথাযথ তদারকির অভাবে বর্তমানে ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে আছে। মেলায় আসা বাদকদের বিশ্রাম ও অন্যান্য প্রয়োজন মেটানোর পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় অনেকেই নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। ঐতিহ্য ধরে রাখতে বিশ্রামাগার সংস্কারসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
বায়নার আশায় দূরদূরান্ত থেকে ঢাকিরা
ঢাকার বিক্রমপুর থেকে আসা ঢাকি সুশীল বলেন, ‘দুর্গাপূজায় ঢাকঢোলের বিকল্প হয় না। এবার মুঠোফোনে বায়না করতে পারিনি, তাই কটিয়াদীর মেলায় এসেছি। আমার দলে আটজন সদস্য। তিনটি বাঁশিও রয়েছে। ৩০ হাজার টাকা বায়না চাচ্ছি।’
মুন্সীগঞ্জ থেকে আসা ঢাকি কৃষ্ণ গোপাল বলেন, ‘আমাদের দলে ১৫ জন সদস্য। ৬০ হাজার টাকা বায়না চাচ্ছি। এখন পর্যন্ত অনেকে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত দাম বলছেন। সাউন্ড বক্সের কারণে অনেকেই পূজার আসল সৌন্দর্য ভুলে যাচ্ছেন। অথচ ঢাকঢোল পূজার অবিচ্ছেদ্য অংশ।’
ময়মনসিংহ থেকে আসা পূজারি আনন্দ মোহন রায় বলেন, ‘আমরা ১০ জনের একটি দল ৫০ হাজার টাকায় চুক্তি করেছি। দলে তিনটি বাঁশি, তিনটি ঢাকঢোল ও মন্দিরা রয়েছে। এখানে এসে পছন্দমতো বাদক দল বেছে নেওয়া যায়।’
গাজীপুর থেকে আসা পূজারি বিজয় সাহা বলেন, ‘এবার ঢাকঢোলের দল বেশি মনে হচ্ছে। পূজার অন্যতম আকর্ষণ ঢাকঢোল আর বাঁশি। এখনো কোনো দলের সঙ্গে চুক্তি করিনি। ঘুরে ঘুরে বাদক দল দেখছি। প্রতিবছর এই মেলায় আসি। এবারও চলে এসেছি।’
ঢাকিদের দেখভালে রয়েছে কমিটি
মেলায় আগত ঢাকিদের তালিকা তৈরি, তাঁদের খোঁজখবর নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দেওয়ার জন্য রয়েছে একটি কমিটি। মেলায় আসা কোনো বাদক দল বায়না না পেলে তাঁদের যাতায়াত খরচ দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে বলে জানিয়েছেন কমিটির সদস্যরা।
ঢাকের মেলা কমিটির সদস্য শম্ভু রায় বলেন, ‘আমরা ঢাকিদের তালিকা করি এবং তাঁদের দেখভাল করি। কেউ বায়না না পেলে তাঁকে যাতায়াত খরচ দিয়ে থাকি।’
কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ বলেন, ‘পুরোনো এই ঢাকের মেলার সার্বিক নিরাপত্তা ও দেখভাল করছে উপজেলা প্রশাসন। নিরাপত্তার জন্য পুলিশের টহল দল রয়েছে।’
দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, ঢাকের ছন্দ আর বাঁশির সুরে কটিয়াদীর এই মেলা আজও দুর্গাপূজার আগমনী আয়োজনের এক অনন্য অনুষঙ্গ। সময়ের পরিবর্তনে নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি হলেও ঢাকিদের আশা, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ঐতিহ্যবাহী এই মেলা টিকে থাকবে আগামী প্রজন্মের জন্যও।