মনির আহমদ আজাদ।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
একজন অসহায় মায়ের নাম রহিমা। পেশায় তিনি ছিলেন গৃহকর্মী। তাঁর স্বামী কয়েক বছর আগে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন। এরপর থেকে অচল শরীর নিয়ে ঘরেই পড়ে থাকেন। পাঁচ সন্তানকে নিয়ে সংসারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ে রহিমার কাঁধে।
জীবিকার তাগিদে তিনি একটি সরকারি চাকরিজীবী দম্পতির বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন। সংসারের রান্নাবান্নাসহ প্রায় সব কাজই ছিল তাঁর ওপর নির্ভরশীল। একদিন তিনি কাজে না গেলে ওই পরিবারের দৈনন্দিন কার্যক্রমই যেন থমকে যেত। কারণ কর্মব্যস্ত স্বামী-স্ত্রীর নিজেদের সংসারের কাজ করার মতো সময় ছিল না। রহিমাই ছিলেন তাঁদের নির্ভরতার প্রতীক।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—একদিন রহিমা নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। দরকার ছিল চিকিৎসা। প্রয়োজন ছিল সামান্য কিছু অর্থ। মাত্র পাঁচ হাজার টাকার অভাবে তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারেননি। কয়েক দিনের অসুস্থতার পর তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন।
রহিমার মৃত্যুতে যে পরিবারে তিনি কাজ করতেন, সেখানে কয়েক দিন কিছুটা অসুবিধা হয়েছিল। পরে তাঁরা আরেকজন গৃহকর্মী নিয়োগ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান। পৃথিবীর নিয়মই এমন—কেউ কারও জন্য থেমে থাকে না। সময় তার নিজস্ব গতিতেই এগিয়ে চলে।
কিন্তু সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয়টি ঘটল তাঁর মৃত্যুর পর। জীবিত অবস্থায় চিকিৎসার জন্য পাঁচ হাজার টাকা জোগাড় হয়নি, অথচ মৃত্যুর পর কুলখানি, দোয়া মাহফিল ও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক আয়োজনের জন্য প্রায় দেড় লাখ টাকা অনায়াসেই সংগ্রহ করা হলো।
রহিমার এই গল্প কেবল একটি পরিবারের নয়; এটি আমাদের সমাজের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। প্রতিদিন দেশের কোথাও না কোথাও এমন ঘটনা ঘটছে। অসুস্থ মানুষ চিকিৎসার অর্থের জন্য অসহায়ের মতো মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ান। অপারেশনের খরচ, হাসপাতালের বিল কিংবা ওষুধ কেনার টাকা জোগাড় করতে না পেরে অনেকেই অকালে প্রাণ হারান। অথচ মৃত্যুর পর সামাজিক মর্যাদা রক্ষার নামে বড় বড় ভোজ, কুলখানি বা নানা আনুষ্ঠানিকতার জন্য অর্থের অভাব হয় না।
একটু ভেবে দেখলেই প্রশ্ন জাগে—যে মানুষটি সময়মতো চিকিৎসা পেলে হয়তো আরও কয়েক বছর বেঁচে থেকে সন্তানদের আগলে রাখতে পারতেন, পরিবারের উপার্জনের ভরসা হতে পারতেন, সমাজের একজন কর্মক্ষম সদস্য হিসেবে অবদান রাখতে পারতেন, তাঁর জীবন রক্ষার জন্য আমরা কেন সময়মতো হাত বাড়াতে পারি না?
ইসলামসহ সব মানবিক মূল্যবোধই অসুস্থ মানুষের পাশে দাঁড়ানো, ক্ষুধার্তকে খাদ্য দেওয়া এবং বিপদগ্রস্তকে সহযোগিতা করার শিক্ষা দেয়। মৃত ব্যক্তির জন্য দোয়া করা, জানাজায় অংশ নেওয়া এবং শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানো অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার চেয়েও বড় দায়িত্ব হলো—একজন মানুষ যখন জীবনের সঙ্গে লড়াই করছেন, তখন তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা।
আজ আমাদের সমাজে প্রয়োজন একটি নতুন সামাজিক সংস্কৃতি—”মৃত্যুর পর নয়, জীবিত অবস্থায় সহযোগিতা।” কুলখানি বা আনুষ্ঠানিকতার জন্য ব্যয় হওয়া অর্থের একটি অংশ যদি চিকিৎসা সহায়তার জন্য ব্যয় করা হতো, তাহলে হয়তো অসংখ্য মা, বাবা, ভাই কিংবা বোন আজও তাঁদের পরিবারের মাঝে জীবিত থাকতেন।
মানবিকতার প্রকৃত পরিচয় জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন নয়; বরং একজন অসহায় মানুষের চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া, একটি পরিবারকে ভেঙে পড়া থেকে রক্ষা করা এবং একটি প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করা। সমাজে প্রতিযোগিতা হোক কে কত বড় ভোজ দিলেন তা নিয়ে নয়, বরং কে কতজন অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ালেন, কে কতজনের চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেন—তা নিয়ে।
মনে রাখতে হবে, একজন জীবিত মানুষের মুখের হাসি, একটি পরিবারের স্বস্তি এবং একটি প্রাণ রক্ষা করার মূল্য কোনো কুলখানির আয়োজন দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
তাই আসুন, আমরা প্রতিজ্ঞা করি—মৃত্যুর পর ফুলের তোড়া নয়, জীবিত মানুষের জন্য ওষুধ কিনে দেব; আনুষ্ঠানিকতার আড়ম্বর নয়, জীবন রক্ষার সংগ্রামে পাশে দাঁড়াব। কারণ একজন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার চেয়ে বড় মানবিক দায়িত্ব এবং বড় সওয়াবের কাজ খুব কমই আছে।