নজরুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টার
২৭ জুলাই ২০২৬, সন্ধ্যা ৬টা
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
যশোরের বাঘারপাড়া উপজেলার জহুরপুর গ্রামের কৃতী সন্তান শামস-উল-হুদা কেবল একজন ক্রীড়া সংগঠকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন শিক্ষা বিস্তার, সমাজসেবা ও মানবকল্যাণে নিবেদিত এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর অসামান্য অবদান যশোরের ক্রীড়াঙ্গনকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে। কর্ম, সততা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে তিনি আজও যশোরবাসীর হৃদয়ে অম্লান হয়ে আছেন।
১৯১৮ সালে যশোরের বাঘারপাড়ার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শামস-উল-হুদা। তাঁর পিতা শেখ আবুল বারী যশোর সিভিল কোর্টে কর্মরত ছিলেন এবং মাতা মোছাম্মৎ আশরাফুন নেছা ছিলেন গৃহিণী। পারিবারিক মূল্যবোধ থেকেই তিনি দায়িত্বশীলতা ও সমাজসেবার শিক্ষা লাভ করেন। তিনি যশোরের সম্মিলনী ইনস্টিটিউশন, যশোর জেলা স্কুল ও সরকারি এম.এম. কলেজ থেকে শিক্ষা জীবন সম্পন্ন করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই ফুটবলের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। সম্মিলনী ইনস্টিটিউশনের ফুটবল দলে গোলরক্ষক হিসেবে তাঁর ক্রীড়া জীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে তিনি চিত্তরঞ্জন ক্লাব, টাউন ক্লাব, ইয়ং মুসলিম ক্লাব ও যতীন্দ্র মোহন ক্লাবের হয়ে যশোর লিগে সুনামের সঙ্গে খেলেন। খেলোয়াড়ি জীবনের পাশাপাশি তিনি দক্ষ রেফারি হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেন।
ক্রীড়াঙ্গনে অবদান
যশোরের ক্রীড়া উন্নয়নে শামস-উল-হুদার অবদান ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। ১৯৫০ সালে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টায় যশোর জেলা ক্রীড়া সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত টানা ৩৬ বছর তিনি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৯ সালে যশোর স্টেডিয়ামের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের সময় আর্থিক সংকট দেখা দিলে তিনি নিজের পৈতৃক বাড়ি থেকে ইট এনে এবং নিজস্ব অর্থায়নে স্টেডিয়ামের সীমানা প্রাচীর নির্মাণে সহযোগিতা করেন।
তাঁর সুদূরপ্রসারী নেতৃত্বের ফলে ১৯৭৬ সালে যশোর জেলা দল জাতীয় ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে শিরোপা জয় করে। তিনি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে), বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) এবং তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান স্পোর্টস ফেডারেশনের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
শিক্ষা ও সমাজসেবায় ভূমিকা
ক্রীড়ার পাশাপাশি শিক্ষা বিস্তারেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তিনি এন.এম. খান প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এছাড়া মাহমুদুর রহমান উচ্চ বিদ্যালয়, উপশহর কলেজ, যশোর রেলওয়ে মহিলা কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। জনসেবার আগ্রহ থেকে তিনি দীর্ঘদিন যশোর পৌরসভার ভাইস চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৭৭-৭৮ সালে বাংলাদেশ ক্রীড়া লেখক সমিতি তাঁকে শ্রেষ্ঠ জাতীয় ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে সম্মানিত করে। ১৯৮৭ সালে তাঁকে মরণোত্তর জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ১৯৮৮ সালে যশোর স্টেডিয়ামের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘যশোর শামস-উল-হুদা স্টেডিয়াম’।
১৯৮৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ৭০ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ২০১১ সালে হামিদপুরে প্রতিষ্ঠিত শামস-উল-হুদা ফুটবল একাডেমি তাঁর আদর্শকে ধারণ করে দেশের প্রতিভাবান ফুটবলার তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।