রায়হান উদ্দিন সরকার
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
বিশেষ প্রতিনিধি, ময়মনসিংহ।
শতবর্ষের সাংস্কৃতিক স্মারক হারানোর শঙ্কা, আগুনের সূত্রপাত এলপিজি গোডাউন থেকে—ধারণা ফায়ার সার্ভিসের
ময়মনসিংহের গৌরীপুরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী ঝলমল সিনেমা হল। আগুনে সিনেমা হলের পাশাপাশি আশপাশের প্রায় ১৫ থেকে ২০টি দোকান পুড়ে গেছে। এতে গৌরীপুরের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্যতম স্মারক এই স্থাপনাটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে গৌরীপুর শহরে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী জানান, ঝলমল সিনেমা হলের পাশেই একটি এলপিজি সিলিন্ডারের গোডাউন ছিল। ওই গোডাউন থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। আগুনে সিনেমা হলের ডেকোরেশন, পুরাতন কাপড়ের দোকানসহ ১৫ থেকে ২০টি দোকান পুড়ে গেছে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে অগ্নিকাণ্ডে মোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি।
শতবর্ষের সাংস্কৃতিক স্মারক ঝলমল
স্থানীয় ইতিহাস গবেষক ও সাংবাদিক রায়হান উদ্দিন সরকার বলেন, ঝলমল সিনেমা হলটি শুধু একটি সিনেমা হল নয়; এটি গৌরীপুর রাজবাড়ির ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। একসময় এটি ছিল ঐতিহ্যবাহী নাট্যমঞ্চ।
তিনি বলেন, শতবছরের সাংস্কৃতিক স্মারক এভাবে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এটি গৌরীপুরের স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য ঐতিহ্যের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।
যেভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ঐতিহাসিক নাট্যমঞ্চ
গৌরীপুর রাজবাড়ির পঞ্চম পুরুষ জমিদার ব্রজেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরীর একমাত্র ছেলে বীরেন্দ্র কিশোর রায় চৌধুরী ছিলেন সংগীত ও নাট্যচর্চার প্রতি গভীরভাবে অনুরাগী। বিংশ শতাব্দীর ত্রিশের দশকে তাঁর উদ্যোগেই গৌরীপুরে এই নাট্যমঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হয়।
কলকাতায় পড়াশোনাকালীন সেখানকার ঐতিহ্যবাহী স্টার থিয়েটার-এর স্থাপত্য ও কাঠামো তাঁকে আকৃষ্ট করে। সেই আদল ও অনুপ্রেরণায় তিনি গৌরীপুরে গড়ে তোলেন অনিন্দ্যসুন্দর এই থিয়েটার হল। পরবর্তীকালে পাকিস্তান আমলে স্থাপনাটি সরকারের মালিকানায় হস্তান্তর হওয়ার পর চলচ্চিত্র প্রদর্শনের জন্য লিজ বা ভাড়া দেওয়া হয়। প্রথমদিকে এটি ‘গিরি সিনেমা হল’ নামে পরিচিত ছিল। পরে নাম পরিবর্তন করে ‘প্রতিমা সিনেমা হল’ রাখা হয়। সর্বশেষে এটি ‘ঝলমল সিনেমা হল’ নামে পরিচিতি লাভ করে।
প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপের পরই অগ্নিকাণ্ড
স্থাপনাটির ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় সম্প্রতি সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি প্রতিনিধি দল গৌরীপুর উপজেলার বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা ও রাজবাড়ি এলাকা জরিপ করে। ঐতিহাসিক নাট্যশালা হিসেবে ঝলমল সিনেমা হলও সেই ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
স্থানীয় ও আঞ্চলিক ইতিহাস গবেষকদের কাছে এই স্থাপনার নির্মাণকাল, নির্মাণব্যয় ও স্থাপত্যশৈলী নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক তথ্য ও নথি সংরক্ষিত রয়েছে।
ইতিহাস-ঐতিহ্য সচেতন মহলের দাবি, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাটির অবশিষ্ট অংশ দ্রুত সংরক্ষণ, স্থাপত্যিক মূল্যায়ন এবং ঐতিহাসিক নথি সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক উদ্যোগ নেওয়া হোক।