মোঃ আব্দুল আউয়াল।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
মানব ইতিহাসে রাজনীতি এবং সাহিত্য — এই দুই ক্ষেত্র একে অপরের চেয়েও কখনো আলাদা ছিল না। রাজনীতি যখন মানুষের শাসন, ক্ষমতা, নিয়ম-নীতির দিকে নির্দেশ করে; সাহিত্য তখন মানুষের অনুভূতি, চেতনা, আশা ও প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর। একে অপরের প্রতি উভয়ই পরিপূরক। ইতিহাসের প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তন — শাসনব্যবস্থা, শক্তি বিন্যাস, সমাজের মূল্যবোধ — সাহিত্যের পাতা থেকে প্রভাবিত হয়েছে, আবার সাহিত্যের মধ্য দিয়েই তা মানুষ অনুভব করেছে, বোঝেছে, প্রশ্ন করেছেন, প্রয়োজনে বিপ্লবও করেছেন।
সাহিত্য হল সেই আয়না, যেখানে শুধু ব্যক্তি জীবনের নয় — সামাজিক, রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণও প্রতিবিম্বিত হয়। তাই, যদি আমরা আজকের সমাজ, রাজনীতি, রাষ্ট্র-চিন্তার বিবর্তন দেখতে চাই, সাহিত্যের প্রেক্ষাপটকে উপেক্ষা করা যায় না।
এই প্রবন্ধে আমি চেষ্টা করব দেখাতে — প্রাচীন থেকে আধুনিক সময় পর্যন্ত, কীভাবে সাহিত্য রাজনৈতিক ধারণাকে রূপ দিয়েছে, বদলায় সমাজ ও রাষ্ট্র-চিন্তা। প্রাচীনকালের সাহিত্যে রাজনৈতিক-নৈতিক শাসন: দার্শনিক ও ন্যায়ের পরিমাপ প্রাচীন ভারত ও গ্রিক উপমহাদেশ — উভয়ই সভ্যতায় সাহিত্য ও রাজনীতি গভীরভাবে গাঁথা ছিল।
প্রথমত, Mahabharata (মহাভারত) — কেবল একটি মহাকাব্য নয়, বরং শাসন, ধর্ম, ন্যায়, রাজধর্ম — অর্থাৎ রাজনীতির ন্যায্যতা ও নৈতিকতার এক দার্শনিক দলিল। মহাভারতের “রাজধর্ম” (Rajadharma) এমন এক আদর্শ স্থাপন করে যে, শাসকের কাজ শুধুমাত্র ক্ষমতা দখল নয়, বরং বিশাল জনপদ (janapada) বা subjects-এর মঙ্গল, ন্যায়, সবার শান্তি ও সুশাসন নিশ্চিত করা। (Research Hub) “ধর্ম” এখানে শুধু একটি ধর্মীয় নির্দেশনা নয় — একটি দায়িত্ব, ন্যায়ের মানদণ্ড, সামাজিক–নৈতিক ন্যায্যতার ভিত্তি: শাসন, সমাজ, ব্যক্তির ন্যায়ী কর্তব্য। (Politics by RK)
অপরদিকে, প্রাচীন গ্রিসে The Republic (রিপাবলিক) — যা লেখেছেন Plato — একটি কাল্পনিক আদর্শ রাষ্ট্রের চিত্র। এখানে প্রতিটি নাগরিক বা শ্রেণি (শাসক, রক্ষক, উৎপাদক) তাদের প্রকৃত সৌভ্রাতৃত্ব ও যোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে তাদের কাজ করে। এক্ষেত্রে “ন্যায়” (justice) ব্যক্তিগত ও সামাজিক — দুই দৃষ্টিকোণ থেকেই বিশ্লেষণ করা হয়। প্রতিটি অংশ তার নিজ দায়িত্ব পালন করলে, সমাজ একটি সংহত, ন্যায়ী ও সতুল্য রাষ্ট্রে পরিণত হবে। (Encyclopedia Britannica) এই liter-philosophical সাহিত্যিক চর্চা প্রাচীন সভ্যতায় দেখায় — রাজনীতি ও শাসন কখনোই ছিল শুধু বল বা জোরের প্রশ্ন, বরং ন্যায়ের, দায়িত্বের, নৈতিকতার।
প্রাচীন পর্যায়ের সেই দার্শনিক রাজনীতি যখন পুঁজি গেড়ে, মধ্যযুগে এসে রাজনীতি অনেকখানি ধর্ম-নির্ভর হয়ে ওঠে। যদিও বাংলায়, ভারতীয় উপমহাদেশে এমন সাহিত্যের বিশদ রূপ পাওয়া যায় — যেভাবে রাজধর্ম, শাসন, শাসকের ন্যায়বিচার, জনগণের কর্তব্য ইত্যাদি প্রাচীন যুগ থেকে ধারাবাহিকভাবে উদাহৃত হয়েছে — তথাপি মধ্যযুগীয় ধর্মীয় সাহিত্য রাজনীতির তুলনায় ধর্ম, শাসন ও সমাজের মধ্যকার সম্পর্ককে ধর্মীয় ন্যায় এবং ধর্মীয় দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করেছিল।
এই সময়, শাসনকেন্দ্রিকতা (রাজনৈরাজ্য) ও ধর্মকেন্দ্রিকতা প্রাধান্য পায়; রাজনীতি ধরা হয় ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্তূপ হিসেবে। ফলে ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও যুক্তি-চেতনার চর্চা সীমাবদ্ধ থাকত।
(দুর্ভাগ্যবশত, এই পর্যায়ের বাংলা/সংক্ষিপ্ত ইতিহাস ও সাহিত্য বিশ্লেষণের জন্য অনলাইনে প্রামাণিক উৎস পাওয়া সীমিত; তবে গঠনগত ইতিহাস ও তুলনমূলক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় — মধ্যযুগীয় রাজনীতি ও সাহিত্য ধর্ম-নির্ভর এবং সাংগঠনিক দায়িত্বের রূপ নিত।)
মধ্যযুগের ধর্ম-নির্ভর সামাজিক কাঠামোর ভাঙন ঘটায় ইউরোপে যে বুদ্ধিজাগরণ — Renaissance — তা রাজনীতি ও সাহিত্যকে এক নতুন দিশা দেখায়। এই সময়, ইউরোপীয় সমাজে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠা আর একমাত্র রূপে নয়; মানব, ব্যক্তি, যুক্তি, যুক্তিবাদ ও বিজ্ঞান গুরুত্ব পায়। শাসন, রাজনীতি, রাষ্ট্রচিন্তা—সবই অনুভব হলো পুনরায়।
এই পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এসে Niccolò Machiavelli তাঁর প্রভাবশালী রচনা The Prince–এ রাজনীতিকে ধর্ম বা ন্যায়ের বাঁধা থেকে মুক্ত করে — যাকে তিনি দেখান “effectual truth of politics” হিসেবে। তাঁর মতে, শাসককে অবশ্যই বাস্তবপক্ষ, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা এবং ক্ষমতা রক্ষার পরিকল্পনায় কাজ করতে হবে। শাসন ও ন্যায়ের প্রথাগত ধারণা, ধর্মীয় আদর্শ, নৈতিক বাধা—সবই পিছনে থাকে, যখন রাজ্যের অস্তিত্ব, একতা বা ক্ষমতা দখলই মুখ্য। (Encyclopedia Britannica) এই “realpolitik” বা বাস্তব রাজনীতি যে একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গার সূচনা, সেটি পরবর্তী বহু রাষ্ট্রব্যবস্থা ও রাজনৈতিক মতাদর্শে প্রতিফলিত হয়েছে। (Fiveable) অতীতে রাজনীতি ছিল ন্যায়ের, ধর্মের ও দার্শনিক আদর্শের প্রতিফলন; রেনেসাঁ-পরবর্তী সময়ে তা রূপ নিল — ক্ষমতা, বাস্তব, স্বার্থ, রাষ্ট্রবাদ এবং বাস্তব চাহিদার দৃষ্টিকোণ থেকে।
ইউরোপীয় ঔপনিবেশবাদ, বাণিজ্যিক ঔপনিবেশিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক শাসন এবং সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সাহিত্যের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। বাংলা ও বঙ্গীয় উপমহাদেশে ১৯শ ও ২০শ শতকে এই প্রতিরোধমূলক সাহিত্য এক শক্তিশালী রাজনৈতিক কণ্ঠ হিসেবে উদ্ভূত হয়। বিশেষ করে, Rabindranath Tagore ও Kazi Nazrul Islam — এই দুই প্রতিভা বাংলা সাহিত্যে জাতীয় চেতনার নতুন দিগন্ত খুলে দেন। (শুদ্ধস্বর ডটকম)
রবীন্দ্রনাথের লেখনিতে ছিল সাংস্কৃতিক আত্মপ্রেম, নীতি-চিন্তা, আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গা — তিনি প্রজাতন্ত্র বা গণতন্ত্রের সম্ভাবনাকে দেখেছিলেন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জাগরণের মধ্য দিয়ে। (Biborton Poth)
অপরদিকে, নজরুল ছিল ‘বিদ্রোহী কবি’ — তাঁর কবিতা, গান, প্রবন্ধে প্রতিফলিত হয়েছে উপনিবেশবাদের শোষণ, সামাজিক বৈষম্য, মানুষের স্বাধীনতা ও মর্যাদার দাবি। ১৯২০-এর দশকে তিনি তার কবিতা ও উপন্যাস, পত্রিকা ও প্রবন্ধের মাধ্যমে সামাজিক ও রাজনৈতিক চেতনা ছড়িয়ে দেন। (Wikipedia)
উপনিবেশবিরোধী এই সাহিত্য একটি “জাতীয় চেতনা” গড়েছিল—রূপ, ভাষা, স্বাধিকার, দায়িত্ব, শোষণহীন সমাজের স্বপ্ন। এই চেতনা পরবর্তী স্বাধীনতা আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক চেতনায় সাহিত্য। ২০শ শতক, বিশেষত বিশ্বযুদ্ধ, পুঁজিবাদ, শ্রেণী বৈষম্য, দারিদ্র্য—এসব কারণে সমাজের নীচ স্তরের মানুষের চেতনা জাগ্রত হয়েছিল। সাহিত্যে এই চেতনা প্রতিফলিত হয় শ্রমিক, কৃষক, পাড়ার মানুষ, দারিদ্র্যগ্রস্ত সাধারণ মানুষের ভয়, আশা, সংগ্রাম হিসেবে। যদিও বাংলায় বা অন্য ভাষায় অনেক বিশ্লেষণ পাওয়া যায়, অনলাইনে সরাসরি প্রামাণিক, নির্ভরযোগ্য উৎসের অভাব রয়েছে। তবে, সাধারণভাবে বলা যায় — এই সাহিত্য রাজনৈতিক ধারণাকে আরও গণতান্ত্রিক, সমতা-ভিত্তিক, শ্রেণিচেতনার দিকে গড়িয়েছে।
বিশ্বায়ন, গ্লোবালাইজেশন, অভিবাসন, জাতিগত–ধর্মীয়–সাংস্কৃতিক বহুমাত্রিকতা — এসব পরিবর্তন আধুনিক সাহিত্যে রাজনীতির নতুন প্রশ্ন ও সংকট অন্তর্ভুক্ত করেছে। উদাহরণস্বরূপ, পশ্চিমা সাহিত্য থেকে শুরু করে বিশ্ব সাহিত্যে নতুন রাজনৈতিক উপমা, স্যাটায়ার, প্রতিবাদ কবিতা, গল্প, উপন্যাস — যা কখনোই সরাসরি রাজনৈতিক তত্ত্ব নয়, কিন্তু রাজনৈতিক বাস্তবতার স্মার্ট, সূক্ষ্ম ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ। যুদ্ধ, শরণার্থী সংকট, গণতান্ত্রিক সঙ্কট, পরিচয় সংকট, ব্যক্তির স্বাধীনতা — সবই সাহিত্যিক ভঙ্গিতে উঠে এসেছে। বাংলা ও অন্যান্য ভাষায়ও একই ধারা — যেখানে সমাজ, রাষ্ট্র, ব্যক্তি, স্বাধীনতা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা — একসঙ্গে বিবেচিত হয়েছে। সাহিত্যে রাজনীতি হয়েছে ব্যক্তিকৃত, অনুভূতিক, মানবিক, সামাজিক।
তবে, সাহিত্য সব সময়ই “পরিবর্তনের গ্যারান্টি” নয়। কিছু কারণ:
যদি আমরা ইতিহাস, সমাজ, রাষ্ট্র, জাতীয় চেতনা, রাজনৈতিক পরিবর্তন — এসবের বিবর্তন দেখতে চাই, তবে শুধু যুদ্ধ, আইন, শাসন, ক্ষমতার হিসাব দেখল যথেষ্ট নয়। আমাদের দেখতে হবে সেই ভাষা, সেই অনুভূতি, সেই স্বপ্ন — যা মানুষের মধ্যে গড়ে তোলে রাজনৈতিক চেতনা, দায়বোধ, শোষণের বিরুদ্ধে অর্পণ, মানবিক মর্যাদা, ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষা।
সাহিত্য, সেই জায়গা যেখানে কথোপকথন হয় রাজনীতির; যেখানে মানুষ বোঝে — যে শাসন, যে রাষ্ট্র, যে সমাজ — তা কেবল ক্ষমতা নয়, দায়িত্ব, ন্যায়, মানবিক মর্যাদা।
প্রাচীন যুগের মহাকাব্য থেকে শুরু করে আধুনিক কবিতা, গদ্য, স্যাটায়ার; রেনেসাঁ-র রাজনৈতিক গ্রন্থ থেকে উপনিবেশবিরোধী বাংলা গান ও কবিতা — সবই সাক্ষ্য যে, সাহিত্যের সঙ্গে ছিল রাজনীতির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক।
আর যদি আমরা ভেবেছি — রাজনীতি শুধুই শাসন, আইন, রাষ্ট্রচেষ্টা — তাহলে ভুলে গেছি মানুষের অনুভূতি, আশা, চেতনা, প্রত্যাশা। সাহিত্য সেই ভুল ভোলাতে পারে না; কারণ সাহিত্যে রাজনীতি হয়ে ওঠে মানুষের।
অতএব, সাহিত্যের মূল্য শুধু ভাষার জন্য নয় — রাজনীতির নৈতিক, মানবিক, দার্শনিক ভিত্তির জন্য।
লেখক-মোঃ আব্দুল আউয়াল,অধ্যক্ষ ।