গাজীপুর প্রতিনিধি
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
গাজীপুরে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে অনিয়ম, হিসাবের অসংগতি এবং প্রকৃত কৃষকদের বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছে। কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া ও শ্রীপুর উপজেলায় সরকারি ধান সংগ্রহের তথ্য যাচাই করতে গিয়ে এসব অসংগতি সামনে এসেছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তথ্য সংগ্রহের সময় এক সাংবাদিককে হেনস্তা, তাঁর মোবাইল ফোন আটকে রাখা, ফোন ক্ষতিগ্রস্ত করা এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
এ ছাড়া গাজীপুর খাদ্য বিভাগের কয়েকজন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অনিয়ম, কথিত প্রভাবশালী চক্র গড়ে তোলা, আর্থিক অনিয়ম এবং নামে-বেনামে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট সরকারি নথি, আর্থিক তথ্য এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
শ্রীপুরে ধান সংগ্রহের পরিমাণ নিয়ে অসংগতি
শ্রীপুর উপজেলায় সরকারি ধান সংগ্রহের পরিমাণ নিয়ে বিশেষভাবে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এক পর্যায়ে ১১ জন কৃষকের কাছ থেকে ১১ টন ধান সংগ্রহের তথ্য দেওয়া হয়। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট এলএসডির এক কর্মকর্তার বক্তব্যে ৩২ থেকে ৩৩ টন ধান সংগ্রহের কথা উঠে এসেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ অবস্থায় প্রকৃতপক্ষে কত টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারি ক্রয় রেজিস্টার, কৃষকদের তালিকা, ক্রয় রসিদ, গুদামের মজুত এবং বিতরণসংক্রান্ত নথি যাচাই করলেই এ অসংগতির প্রকৃত কারণ জানা সম্ভব।
অভিযোগ রয়েছে, তালিকায় নাম থাকা কয়েকজন কৃষক দাবি করেছেন, তাঁরা সরকারি সংগ্রহকেন্দ্রে ধান বিক্রি করেননি। এ ছাড়া একজন ব্লক পর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্যেও সরকারি কেন্দ্রে ধান কেনা না হওয়া এবং কৃষকদের বারবার ফিরে যাওয়ার প্রসঙ্গ এসেছে বলে জানানো হয়েছে।
তবে এসব বক্তব্য ও তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা জরুরি। তালিকাভুক্ত কৃষকদের কাছ থেকে প্রকৃতপক্ষে ধান কেনা হয়েছে কি না, তাঁদের নামে কোনো ক্রয় দেখানো হয়েছে কি না এবং সরকারি অর্থের বিপরীতে যথাযথ পরিমাণ ধান গুদামে জমা হয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।
সরকারি দরে ধান বিক্রির সুযোগ পাচ্ছেন কি কৃষক?
সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমের অন্যতম উদ্দেশ্য কৃষকদের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা। কিন্তু সরকারি সংগ্রহকেন্দ্রে ধান বিক্রির সুযোগ না পেলে কৃষকদের বাধ্য হয়ে বাইরে কম দামে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগে প্রতি মণ ধানের সরকারি দর ১ হাজার ৪৩৬ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট মৌসুমের সরকারি প্রজ্ঞাপন যাচাই করে নির্ধারিত মূল্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কৃষকদের নামে ধান বিক্রির হিসাব দেখানো হলে সেই হিসাবের পক্ষে যথাযথ নথি রয়েছে কি না, প্রকৃত কৃষকরা সরকারি সুবিধা পাচ্ছেন কি না এবং সংগ্রহ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা বজায় রাখা হচ্ছে কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
খাদ্য বিভাগে কথিত প্রভাবশালী চক্রের অভিযোগ
গাজীপুর খাদ্য বিভাগকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার ও কথিত দালাল চক্রের কার্যক্রম নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। অভিযোগ অনুযায়ী, সোহেল নামের এক ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে একই অবস্থানে দায়িত্ব পালন করায় সংশ্লিষ্ট মহলে তাঁর প্রভাব তৈরি হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে খাদ্য বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা ও অন্যান্য ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এ ধরনের যোগাযোগের মাধ্যমে কোনো অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে কি না, কিংবা সরকারি কার্যক্রমে কেউ বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
তবে কথিত চক্রের অস্তিত্ব, এর কার্যক্রম এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ ছাড়া নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে পদায়ন ও বদলির নথি, দাপ্তরিক যোগাযোগ, সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।
কর্মকর্তাদের অফিসে উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালন নিয়ে প্রশ্ন
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় এবং সংশ্লিষ্ট খাদ্য কর্মকর্তাদের নিয়মিত অফিসে উপস্থিতি ও দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন নিয়েও অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কয়েকজন কর্মকর্তা নিয়মিত অফিসে উপস্থিত না থেকেও সরকারি সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করছেন।
এ অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে উপস্থিতি রেজিস্টার, ছুটির নথি, দাপ্তরিক পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং দায়িত্ব বণ্টনের কাগজপত্র পর্যালোচনা করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করছেন কি না, তাঁদের অনুপস্থিতির কোনো অনুমোদিত কারণ রয়েছে কি না এবং সরকারি বিধিবিধান অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হতে পারে।
সরকারি দায়িত্ব পালনে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
দীর্ঘদিন একই অবস্থানে থাকা ও সম্পদ অর্জন নিয়ে অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন একই পদে বা দায়িত্বে কীভাবে বহাল রয়েছেন, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের দাবি, পদায়ন, বদলি ও দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অনিয়ম বা প্রভাব কাজ করেছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।
এ ছাড়া গোপন সূত্রের বরাতে সোহেলের বিরুদ্ধে অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল অর্থ উপার্জন এবং নামে-বেনামে সম্পদ গড়ে তোলার অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে যাচাই করা আর্থিক নথি, সম্পদের বিবরণ বা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা প্রমাণ এই প্রতিবেদনের জন্য পাওয়া যায়নি।
এ অবস্থায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বৈধ আয়ের উৎস, সম্পদের তথ্য এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
তথ্য সংগ্রহের সময় সাংবাদিককে হেনস্তার অভিযোগ
সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম নিয়ে তথ্য সংগ্রহের সময় গাজীপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে এক সাংবাদিককে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারী সাংবাদিকের দাবি, তথ্য সংগ্রহের সময় তাঁর মোবাইল ফোন কেড়ে নেয় সোহেল । এ সময় একটি ইনফিনিক্স ফোন ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং একটি আইফোন নিয়েও জটিলতা সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে । সরকারি চেয়ারে বসে এসির বাতাস উপভোগ করেন আর জনগণের টাকায় যাদের বেতন হয় তারা কি? দেশের একজন নাগরিকের সাথে এরকম আচরণ করতে পারে কিনা এবং তাদের বিচার কি হবে তা এখন দেখার অপেক্ষায় রয়েছে সাধারণ মানুষ।