মামুন রণবীর, নেত্রকোণা জেলা প্রতিনিধি।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
নেত্রকোণার দুর্গাপুরে নিহত সাংবাদিক লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির প্রায় এক বছর আগে সাংবাদিকদের সাথে জেলা পুলিশ সুপারের মতবিনিময় অনুষ্ঠানে নিজের মৃত্যুর আশঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন।
তিনি স্থানীয় বিভিন্ন সন্ত্রাসী ও চোরাকারবারি ৮টি গ্রুপের কথা উল্লেখ করেন। এসময় তিনি বলেন, ‘দুর্বৃত্তরা অস্ত্র নিয়ে বসে আছে আমাকে পেলে গুলি করার জন্য।’ এক বছর পর তার সেই কথাই সত্য হলো।
গত বছরের নভেম্বরে দেয়া তার ওই বক্তব্যের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে তিনি জেলা পুলিশ সুপারকে বিভিন্ন অপরাধের বিষয়ে অবহিত করেন।
নেত্রকোণা জেলা পুলিশ সুপার মো. তরিকুল ইসলামের উপস্থিতিতে তিনি বলেন, ‘আমি আপনার এখানে এখন যে বসে আছি, আমার কাছে ম্যাসেজ আসছে-তারা রাস্তায় বসে আছে দুইটা অস্ত্র নিয়ে। একটা নাইন এমএমে পাঁচটা গুলিসহ তারা বসে আছে। আমি যাওয়ার সময় গুলি করবে। যদিও আমি আজকে যাব না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি অর্গানাজড ক্রাইম নিয়ে কাজ করি। এই জেলায় দুর্ধর্ষ ও সশস্ত্র যেসব গ্রুপ আছে, তাদের নিউজ আমি করে থাকি। মাদক থেকে শুরু করে সব। এই জেলায় সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হলো দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা। এখানে চোরাচালানের সঙ্গে সংঘবদ্ধ ৮টি গ্রুপ আছে, তারা অস্ত্র বহন করে। ককটেল, বিস্ফোরক, মাদকসহ সব কিছুই করে তারা।’
এসপির উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ‘এই আসামিদের যদি ধরা না হয়, তাহলে সবাইকে সাক্ষী রেখে বলছি, হয় আমাকে দেশ ছেড়ে চলে যেতে হবে, না হয় তাদের চেয়ে বড় সন্ত্রাসী হতে হবে। এই সিদ্ধান্তটা এখন আপনাদের নিতে হবে।’
নিরাপত্তা শঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘উপজাতি শ্বশুরবাড়িতে আমার সন্তান হওয়ার কারণে আমি সেখানে আছি। কিন্তু যেকোনো সময় সে উপজাতির বাড়িতেও তারা আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারে। কালকেও চেষ্টা করেছিল পারে নাই। এই নিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সৃষ্টির চেষ্টাও হতে পারে।’
গত বৃহস্পতিবার রাত সোয়া ৮টার দিকে পৌরসভার তেলুঞ্জিয়া এলাকায় সাংবাদিক আলিফ ফকিরকে ৬টি গুলি করে মেরে ফেলে সন্ত্রাসীরা। এ ঘটনায় শুক্রবার রাতে নিহতের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা অজ্ঞাত ৮ জনকে আসামী করে দুর্গাপুর থানায় মামলা করে।
বেসরকারি আইপি টিভি ‘রূপসী বাংলার’ নেত্রকোণা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে কর্মরত ছিলেন লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির। তিনি ‘ডিটেকটিভ আর্টিকেল’ নামে একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনা করতেন। ওই পেজে তিনি মাদক কারবার ও চোরাচালান সহ বিভিন্ন অপরাধ নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করতেন। তার পৈতৃক বাড়ি কলমাকান্দার পোগলা এলাকায়। তিনি দুর্গাপুরের বিরিশিরি এলাকার শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাত ৮টার দিকে লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির তেলুঞ্জিয়া এলাকার একটি দোকানে তার রেখে যাওয়া মুঠোফোন নিতে যান। এসময় দুই যুবক তার পিছু নেয়। এর পরপরই কয়েকটি গুলির শব্দ শোনা যায়। এ ঘটনায় স্থানীয় লোকজন এগিয়ে এলে দুর্বৃত্তরা দ্রুত পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার চেষ্টা করলেও কিছুক্ষণের মধ্যে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী একটি চা দোকানের মালিক রবিন রাংসা জানান, গুলির ঘটনার আগে আনুমানিক ৩০-৩৫ বছর বয়সী দুই ব্যক্তি তার দোকানে এসে সিগারেট কেনেন। ওই সময়ে আলিফ ফকির সেখান থেকে চা খেয়ে বের হচ্ছিলেন। তিনি বলেন, ওই দুই ব্যক্তি সিগারেট নিয়ে আলিফ ফকিরকে অনুসরণ করে তার পিছু নেন। এর কিছুক্ষণ পরই কয়েকটি গুলির শব্দ শুনতে পাই।
নিহত সাংবাদিকের স্ত্রী আনন্দিতা সাংমা বলেন, আমি বাসায় ছিলাম। এসময় জানতে পারি আমার স্বামীকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। খবর পেয়ে আমি দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে আমার স্বামীকে মাটিতে পড়ে থাকতে দেখি। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় তাকে দ্রুত দুর্গাপুর হাসপাতালে নিয়ে যাই।
দুর্গাপুর থানার ওসি খন্দকার শাকের আহমেদ বলেন, নিহত সাংবাদিকের মাথা, গলা, বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছয়টি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে। পুলিশ ঘটনা তদন্ত করছে। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। আসামীদের ধরতে পুলিশী অভিযান অব্যাহত আছে।
লুৎফুজ্জামান আলিফ ফকির এর আগেও দুর্বৃত্তদের দ্বারা হামলার শিকার হয়েছিলেন। গত বছরের ১০ নভেম্বর দুপুরে সোমেশ্বরী নদীর তেরিবাজার ঘাট এলাকায় বালুচরে দুর্বৃত্তরা তাকে কুপিয়ে জখম করেছিল।