মনির আহমদ আজাদ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
এক সময় সরকারি চাকরি মানেই ছিল জীবনের নিশ্চয়তার প্রতীক—মাস শেষে নির্ভরযোগ্য বেতন, আর অবসরের পরে মোটা অঙ্কের সঞ্চয়। সমাজে সম্মান, পরিবারের গর্ব, আর আত্মীয়-স্বজনের চোখে এক ধরনের স্থিতিশীলতার প্রতিচ্ছবি—সব মিলিয়ে সরকারি চাকরি যেন এক ‘সোনার হরিণ’। সেই স্বপ্নকে ঘিরেই গড়ে উঠতো অসংখ্য তরুণের জীবনযুদ্ধ, আর মা-বাবার অবিরাম প্রত্যাশা।
কিন্তু সময় বদলেছে, বদলেছে বাস্তবতার নির্মম সমীকরণও। আজকের বাংলাদেশে একই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে কেউ যখন সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করছে, তখন অন্য কেউ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দিয়ে কয়েকগুণ বেশি বেতন পাচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ধারণা এখন প্রশ্নবিদ্ধ—সরকারি চাকরি কি সত্যিই সেই আগের মতো স্বপ্নের?
এই পরিবর্তনের বাস্তব চিত্র ফুটে ওঠে নিফুল ইয়াছমিনের জীবনে। তিনি একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কয়েক বছর দায়িত্ব পালন করার পর সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। হিসাববিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করা এই শিক্ষিকা সরকারি চাকরির নিরাপদ বলয় ছেড়ে যোগ দেন একটি বেসরকারি কলেজে লেকচারার হিসেবে। তার ভাষায়, “সরকারি চাকরি ছেড়ে আসার অন্যতম কারণ—বেসরকারিতে দ্বিগুণ বেতন ও আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য।”
এই একটি উদাহরণই যেন বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। সরকারি চাকরিজীবীদের আয় যেখানে প্রায় স্থির, সেখানে ব্যয়ের গ্রাফ ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী। বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০১৫ সালের পে-স্কেলের পর ২০২৬ সালে এসে দ্রব্যমূল্যের এই অস্বাভাবিক উল্লম্ফন জীবনের হিসাব-নিকাশকে কঠিন করে তুলেছে। অথচ সেই অনুপাতে বাড়েনি বেতন-ভাতা।
ফলে উপরি আয় বা অতিরিক্ত সুবিধাবিহীন অনেক সরকারি চাকরিজীবী আজ দিশেহারা। সংসারের ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাদের জীবন যেন এক অদৃশ্য চাপে পিষ্ট হচ্ছে। একসময় যে চাকরি ছিল স্বপ্নপূরণের সিঁড়ি, তা আজ অনেকের কাছে হয়ে উঠছে টিকে থাকার সংগ্রামের আরেক নাম।
তবে এর মধ্যেও প্রশ্ন রয়ে যায়—সমাজের কাঠামো ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা যদি এভাবেই পরিবর্তিত হতে থাকে, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কি আর সরকারি চাকরিকে সেই আগের মতো মর্যাদা ও আকাঙ্ক্ষার আসনে বসাবে?
সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে বদলে যাচ্ছে মানুষের স্বপ্ন, বদলে যাচ্ছে সাফল্যের সংজ্ঞা। আর সেই পরিবর্তনের ভেতরেই ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে এক সময়ের কাঙ্ক্ষিত ‘সোনার হরিণ’—সরকারি চাকরি।