মনির আহমদ আজাদ।।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় এক ভয়াবহ দ্বৈততা দীর্ঘদিন ধরে শিকড় গেড়ে বসেছে, যা এখন আর লুকানো নেই — বরং সমাজ এটিকে স্বাভাবিক বলে মেনে নিতে শুরু করেছে। একজন রাজনৈতিক নেতা যিনি বাহ্যত ধার্মিক, নামাজী ও ভদ্র বলে পরিচিত, তিনিই আবার নিজের দলীয় ক্যাডার, এলাকার মাস্তান ও সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে ভোট কব্জা করেন, প্রতিপক্ষকে দমন করেন এবং ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে থাকেন — এই চিত্র এখন দেশের আনাচে-কানাচে পরিচিত দৃশ্য।
নিজে সরাসরি হাত না নোংরা করলেও যিনি জেনেশুনে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেন, তিনি নৈতিকভাবে সেই অন্যায়েরই অংশীদার — এই সহজ সত্যটি আজ সমাজ ভুলতে বসেছে। এরচেয়েও বেদনাদায়ক চিত্র পারিবারিক অঙ্গনে — যে পিতার কপালে নামাজের দাগ, জায়নামাজে যাঁর নিয়মিত সময় কাটে, সেই পিতাই তাঁর পুত্রকে দলীয় লেবাসে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও সন্ত্রাসী কার্যকলাপে লিপ্ত দেখে মুচকি হাসেন এবং মনে মনে ভাবেন — “ছেলে এলাকায় প্রভাবশালী হয়েছে।” এই বিকৃত গর্বই হলো সমাজের সবচেয়ে বড় ক্ষতের জায়গা, কারণ এখানে ধর্মীয় অনুশীলন পরিণত হয়েছে নিছক আনুষ্ঠানিকতায় — যার সাথে ন্যায়-অন্যায়ের কোনো সম্পর্ক নেই। ইসলামের সুস্পষ্ট শিক্ষা হলো নামাজ মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রাখে, কিন্তু যে নামাজ পুত্রের সন্ত্রাসকে থামাতে পারে না, সেই নামাজ কি শুধু অভ্যাসে পরিণত হয়নি? কবির সেই প্রশ্ন তাই আজও বুকে বিঁধে — “আল্লাহতে যার পূর্ণ ঈমান, কোথায় সেই মুসলমান।”
এই দুষ্টচক্র টিকে থাকে কারণ এতে প্রতিটি স্তরে নীরব সম্মতি আছে — নেতা পান ক্ষমতা, ক্যাডার পায় অভয় ও অর্থ, পিতা পান সামাজিক প্রতিপত্তি, আর সমাজ পায় দীর্ঘমেয়াদী ক্ষয় ও অবক্ষয়। এই চক্র ভাঙতে হলে চাই পারিবারিক সাহস — সন্তানের অন্যায়কে না বলার নৈতিক শক্তি; চাই রাজনৈতিক জবাবদিহিতা — “আমি জানতাম না” এই অজুহাত আর চলবে না; এবং চাই সামাজিক সচেতনতা — সন্ত্রাসকে স্বাভাবিক না বলার দৃঢ় অবস্থান। যেদিন ধর্মীয় অনুশীলন ও নৈতিক দায়বদ্ধতা একসূত্রে গাঁথা হবে, যেদিন পিতা পুত্রের চরিত্রে গর্বিত হবেন — ক্ষমতায় নয়, সেদিনই এই নীরব পাপের চক্র ভাঙার সূচনা হবে।
[লেখকের নিজস্ব মতামত ]