
মনির আহমদ আজাদ।।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বিষয় প্রায়ই লক্ষ করা যায়—ক্ষমতায় যে দলই আসুক না কেন, রাষ্ট্রকে দলীয় সম্পত্তি হিসেবে দেখার প্রবণতা এবং সরকারকে “আমাদের” ও “তোমাদের” ভাগে বিভক্ত করার সংস্কৃতি ক্রমেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে। অথচ গণতন্ত্রের মৌলিক দর্শন বলে, নির্বাচনের মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দল সরকার গঠন করলেও সেই সরকার কেবল দলীয় সমর্থকদের নয়; রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিকের সরকার।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একাধিক রাজনৈতিক দলের অস্তিত্ব স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। জনগণের ভোটে একটি দল সরকার গঠন করে, আর অন্য দল বা দলগুলো সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে। এই বিরোধিতা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়, বরং সরকারের কর্মকাণ্ডের গঠনমূলক সমালোচনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য। কিন্তু আমাদের দেশে রাজনৈতিক সংস্কৃতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতাকর্মী মনে করেন রাষ্ট্র পরিচালনার একচ্ছত্র অধিকার যেন তাদেরই। অন্যদিকে বিরোধী দলও প্রায়শই সরকারকে “তোমাদের সরকার” বলে সম্বোধন করে, যেন রাষ্ট্র পরিচালনা একটি নির্দিষ্ট দলের ব্যক্তিগত বিষয়।
বাস্তবে সরকার কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। প্রধানমন্ত্রী বা সরকারপ্রধান যখন দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তিনি শুধু দলীয় কর্মীদের নেতা থাকেন না; তিনি হয়ে ওঠেন দেশের সকল নাগরিকের প্রতিনিধি। তার সিদ্ধান্ত, নীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের সুফল বা কুফল সমগ্র জাতিকেই বহন করতে হয়। ফলে ক্ষমতাসীনদের দায়িত্ব হলো দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে দেশের প্রতিটি নাগরিককে সমানভাবে বিবেচনা করা।
একইভাবে বিরোধী দলেরও দায়িত্ব রয়েছে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও সাংবিধানিক ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা। নির্বাচিত সরকারকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে নয়। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের ভূমিকা হলো জনগণের স্বার্থে সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়া, বিকল্প চিন্তা উপস্থাপন করা এবং গণতান্ত্রিক ভারসাম্য রক্ষা করা।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা “আমাদের সরকার” ও “তোমাদের সরকার” মানসিকতা গণতন্ত্রকে দুর্বল করে এবং জাতীয় ঐক্যের পথে বাধা সৃষ্টি করে। একটি পরিণত গণতান্ত্রিক সমাজে প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতি, যেখানে ক্ষমতাসীনরা মনে করবেন তারা পুরো জাতির সেবক, আর বিরোধী দল মনে করবে তারা রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল অংশীদার।
রাষ্ট্র কোনো দলের নয়, রাষ্ট্র সকল নাগরিকের। আর নির্বাচিত সরকারও কোনো গোষ্ঠীর নয়; সরকারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও দায়িত্ব দেশের প্রতিটি মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত। গণতন্ত্রের প্রকৃত সৌন্দর্য এখানেই—ক্ষমতার পালাবদল হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র ও জনগণের মালিকানা কখনো বদলায় না।