মনির আহমদ আজাদ।।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনৈতিক দল মানুষের অধিকার, উন্নয়ন ও জনকল্যাণের জন্য কাজ করার কথা। কিন্তু বাস্তবতায় দেখা যায়, কিছু ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয়কে জনসেবার পরিবর্তে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা, প্রভাব বিস্তার এবং অন্যায় সুবিধা অর্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। এ প্রবণতা শুধু অশিক্ষিতদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষিত ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিরাও একই মানসিকতার পরিচয় দেন।
সমাজে এমন বহু ঘটনা দেখা যায়, যেখানে কোনো ব্যক্তি অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে বা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বললে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। অনেক সময় দলীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসন, থানা-পুলিশ কিংবা স্থানীয় প্রভাবশালীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করা হয়। ফলে প্রকৃত সত্য আড়ালে থেকে যায় এবং ভুক্তভোগী ব্যক্তি ন্যায়বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধার সম্মুখীন হন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই প্রবণতার মূল কারণ হলো রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবক্ষয়, নৈতিক শিক্ষার অভাব এবং আইনের দুর্বল প্রয়োগ। যখন কোনো ব্যক্তি বিশ্বাস করে যে তার রাজনৈতিক পরিচয় তাকে আইনের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাবে, তখন সে অন্যায় করতে দ্বিধাবোধ করে না। এর ফলে সমাজে ভয়, বিভক্তি এবং অবিশ্বাসের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
আইনের দৃষ্টিতে কোনো নাগরিকের রাজনৈতিক পরিচয় তার অপরাধ বা নির্দোষ হওয়ার মাপকাঠি হতে পারে না। সংবিধান ও রাষ্ট্রের আইন সবার জন্য সমান। কিন্তু বাস্তবে যদি রাজনৈতিক প্রভাব বিচার ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে, তাহলে আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা কমে যায়।
সামাজিকভাবে এ পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ অন্যায়কারীরা যখন দলীয় ছত্রছায়ায় নিজেদের নিরাপদ মনে করে, তখন সৎ ও ন্যায়পরায়ণ মানুষ নিরুৎসাহিত হয়। দীর্ঘমেয়াদে এটি সমাজে ন্যায়বোধ, সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে নাগরিক পরিচয়কে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে এবং রাজনৈতিক দলগুলোকেও অপরাধীদের দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, আইনের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করতে হবে। অন্যায় যে-ই করুক, তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক সমাজের প্রধান শর্ত।
রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু অন্যায়ের কোনো দল নেই। ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যখন রাজনৈতিক প্রভাবকে অন্যায়ের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা। তাই আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং সামাজিক ন্যায়বোধ জাগ্রত করাই এ সংকট থেকে উত্তরণের সবচেয়ে কার্যকর পথ।