মনির আহমদ আজাদ, লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি।
দেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ পেতে হোয়াটসঅ্যাপে টেলিগ্রাফ বাংলাদেশ ফলো করুন।
“বাবা নেই, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন আছে; সেই স্বপ্নই একদিন সন্তানের সাফল্যের সিঁড়ি হয়ে ওঠে।”—এই সত্যকেই যেন জীবন্ত করে তুলেছেন চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার উত্তর আমিরাবাদ তালুকদার পাড়ার মেধাবী কন্যা তাহমিনা সোলতানা শিমুল।
৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে তিনি শুধু নিজের জীবনের একটি অধ্যায়ই উন্মোচন করেননি; একই সঙ্গে পূরণ করেছেন প্রয়াত বাবার বহুদিনের লালিত স্বপ্ন। তাঁর এই অর্জন আজ উত্তর আমিরাবাদের গণ্ডি পেরিয়ে পুরো লোহাগাড়ার গর্বে পরিণত হয়েছে।
তাহমিনা সোলতানা শিমুল মরহুম আবুল হোসেন মাস্টারের কনিষ্ঠ কন্যা। আবুল হোসেন মাস্টার ছিলেন পদুয়া এসিএম উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একজন প্রজ্ঞাবান ও সুনামধন্য সিনিয়র শিক্ষক। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞানই বিতরণ করেননি, শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে বপন করেছিলেন সততা, মানবিকতা ও আদর্শের বীজ।
কিন্তু জীবনের নির্মম বাস্তবতা খুব অল্প বয়সেই তাহমিনার হারায় তাঁর সবচেয়ে বড় আশ্রয়—বাবাকে। বাবার স্নেহ, পরামর্শ আর ছায়াহীন সেই দিনগুলো সহজ ছিল না। অনেকের মতো তিনিও চাইলে দুঃখের কাছে হার মানতে পারতেন। কিন্তু তিনি ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছিলেন। চোখের অশ্রুকে শক্তিতে, কষ্টকে প্রেরণায় এবং বাবার স্মৃতিকে জীবনের দিশারিতে পরিণত করেছিলেন।
প্রতিটি পরীক্ষা, প্রতিটি সংগ্রাম এবং প্রতিটি কঠিন মুহূর্তে তিনি মনে রেখেছেন বাবার শিক্ষা—পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। সেই বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরে নিরলস অধ্যবসায়, কঠোর আত্মনিয়োগ ও অদম্য মনোবল নিয়ে এগিয়ে গেছেন নিজের লক্ষ্যপানে।
অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ৪৭তম বিসিএস পরীক্ষায় শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে তিনি প্রমাণ করলেন—স্বপ্নের পথে বাধা থাকতে পারে, কিন্তু দৃঢ় সংকল্প থাকলে কোনো বাধাই শেষ কথা নয়।
তাঁর এই সাফল্যে আনন্দে ভাসছে পরিবার, আত্মীয়-স্বজন, শুভানুধ্যায়ী এবং সমগ্র লোহাগাড়াবাসী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমজুড়ে বইছে শুভেচ্ছার বন্যা। সবাই একবাক্যে বলছেন, এটি শুধু একজন তরুণীর ব্যক্তিগত অর্জন নয়; এটি শিক্ষা, অধ্যবসায় ও আত্মবিশ্বাসের বিজয়ের গল্প।
এলাকার প্রবীণরা মনে করেন, তাহমিনার এই সাফল্য নতুন প্রজন্মের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। গ্রামের কোনো শিক্ষার্থী যখন স্বপ্ন দেখতে ভয় পাবে, তখন তাহমিনার গল্প তাকে সাহস দেবে। যখন প্রতিকূলতা সামনে এসে দাঁড়াবে, তখন তাঁর সংগ্রামের কাহিনি নতুন করে পথ দেখাবে।
আজ তাহমিনা সোলতানা শিমুল শুধু একজন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার নন; তিনি একজন সংগ্রামী কন্যা, একজন স্বপ্নজয়ী মানুষ এবং লোহাগাড়ার অহংকার। তাঁর অর্জন প্রমাণ করে—সন্তানের সাফল্যের মধ্য দিয়েই একজন আদর্শ বাবার স্বপ্ন বেঁচে থাকে, একজন শিক্ষকের আদর্শ অমর হয়ে থাকে, আর একটি জনপদ খুঁজে পায় নতুন অনুপ্রেরণার আলো।
তাহমিনার এই সাফল্য আরও অসংখ্য তরুণ-তরুণীকে শিক্ষা, সততা, অধ্যবসায় এবং আত্মবিশ্বাসের পথে এগিয়ে যেতে উদ্বুদ্ধ করুক—এটাই লোহাগাড়াবাসীর প্রত্যাশা।